বাংলাদেশে সাড়ে ৭৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে জাপান, টোকিও সফরে প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে জাপান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, ডলারের হিসাবে ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে শীর্ষ বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে এই বিনিয়োগের ঘোষণা আসবে বলে জানা গেছে।
জাপানের গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য এই অর্থের সংস্থান করতে রাজি হয়েছে জাপান সরকার।
ঘোষণার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব হ্রাস করা। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে এই উদ্যোগে।
এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে অটোমোবাইল ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে জাপানি ট্রেডিং হাউস সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্য অংশীদারদের উদ্যোগে গড়ে তোলা বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে।
প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি সই করেছে জাপান। সেই চুক্তির ভিত্তিতেই এবার বড় আকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সামনে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন। সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তার কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তিনি। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেবেন তারেক রহমান।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এই সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করা নিয়ে আলোচনা হবে। গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই তথ্য জানান।
তিনি আরও জানান, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে জাপানের সঙ্গে আটটির মতো সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন-চারটি সমঝোতা স্মারক সফরে স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগও এই সফরে তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রসচিব।
সফর ঘিরে একটি ব্যতিক্রমী চিত্রও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী টোকিওতে থাকছেন না; তাকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সফরের কূটনৈতিক বিষয় ও সার্বিক সমন্বয়ে সহায়তার জন্য বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে, তিনি ইতিমধ্যে জাপানে পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কোনো দেশ সফরের সময় সেখানে রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিত থাকার নজির খুবই কম।
সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে থাকছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ-জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তারেক রহমানের চতুর্থ বিদেশ সফর।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপান দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। এবার সেই সম্পর্ক বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
এখন সবার নজর ২৭ অক্টোবরের শীর্ষ বৈঠক ও যৌথ বিবৃতির দিকে। সেখানে বিনিয়োগের ঘোষণা আনুষ্ঠানিক রূপ পেলে বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক জোন খাতে জাপানি বিনিয়োগের নতুন অধ্যায় শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।






