পতাকা তোলা নিয়ে সংঘর্ষে উত্তপ্ত মোয়ালে, শত শত ইথিওপীয় পালিয়ে কেনিয়ায়
ইথিওপিয়ার সীমান্ত শহর মোয়ালে আঞ্চলিক বাহিনীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় শত শত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী কেনিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। কেনিয়ার পুলিশ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, পালিয়ে আসা মানুষদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। প্রতিবেশী একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সোমালি রাজ্যের পতাকা প্রকাশ্যে তোলাকে কেন্দ্র করে অনুগতদের মধ্যে বিরোধ থেকে এই লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা গেছে।
কেনিয়ার পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইথিওপীয়রা মোয়ালের কয়েকটি প্রবেশপথ দিয়ে কেনিয়ায় ঢুকেছেন। সেসসি, কোরে, বিয়াশারা, ফাউন্ডেশন ও মিতি এলাকা দিয়ে তারা সীমান্ত অতিক্রম করেন। হঠাৎ করে এত মানুষের আগমনে সীমান্ত এলাকায় তৎপরতা বেড়ে গেছে এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করছে।
পুলিশ বলেছে, পালিয়ে আসা মানুষেরা ইথিওপিয়ার ওরোমিয়া ও সোমালি আঞ্চলিক রাজ্যের নেতাদের মধ্যকার উত্তেজনা থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়েছেন। দুই আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনই এবার সরাসরি সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে বলে তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
মোয়ালে শহরে গুলির শব্দ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কথাও জানিয়েছে কেনিয়ার পুলিশ। সংঘর্ষের সময় শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। নারী ও শিশুদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মানবিক উদ্বেগও বেড়েছে।
ইথিওপিয়ার সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত রোববার সোমালি আঞ্চলিক রাজ্যের পতাকা তোলা নিয়ে বিরোধ থেকে মোয়ালের লড়াই শুরু হয়। সোমালি আঞ্চলিক রাজ্যটি ইথিওপিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি আঞ্চলিক রাজ্য। একটি পতাকা তোলার ঘটনা কীভাবে এত বড় সংঘর্ষে গড়াল, তা থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে জমে থাকা উত্তেজনার গভীরতা বোঝা যায়।
সেই বিরোধ ধীরে ধীরে উত্তেজনা বাড়িয়ে ওরোমিয়া ও সোমালি অঞ্চলের বাহিনীগুলোর মধ্যে সরাসরি লড়াইয়ে রূপ নেয়। আঞ্চলিক বাহিনীগুলো মুখোমুখি হয়ে পড়ায় সীমান্ত শহরের সাধারণ বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন এবং অনেকে কেনিয়ার দিকে পালাতে বাধ্য হন।
মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছে কেনিয়া রেড ক্রস। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে এবং শস্য ও পোরিজ তৈরির আটাসহ জরুরি সামগ্রী বিতরণ করছে। পালিয়ে আসা পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য ও আশ্রয়ই এখন সবচেয়ে জরুরি চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে কেনিয়া রেড ক্রস বলেছে, ‘এই সহায়তা প্রাথমিকভাবে ১,০০০ পরিবারের কাছে পৌঁছাবে।’ অর্থাৎ প্রথম ধাপে এক হাজার পরিবারকে লক্ষ্য করে ত্রাণ কার্যক্রম সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বিপন্ন মানুষগুলো দ্রুত সহায়তা পান।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ঠিক কতজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাদের চাহিদা কী, তা নিরূপণে বিশেষজ্ঞরা মূল্যায়ন চালাচ্ছেন। মূল্যায়ন শেষ হলে সহায়তার পরিধি বাড়ানো বা নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই আঞ্চলিক সংঘর্ষ ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিগ্রাই অঞ্চলের আরও বড় সংঘাত থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে ঘটছে। তিগ্রাইয়ে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী জোটের লড়াই চলছে। ফলে দেশটির একাধিক প্রান্তে একই সময়ে সহিংসতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
মোয়ালের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, ইথিওপিয়ার আঞ্চলিক বিভাজন ও পরিচয়ের টানাপোড়েন কত সহজে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশেও মানবিক চাপ তৈরি করতে পারে। কেনিয়ার সীমান্ত এলাকায় এখন শত শত বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়, আর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংঘর্ষ কত দ্রুত থামে তার ওপর।
আপাতত কেনিয়া রেড ক্রসের ত্রাণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রমই পালিয়ে আসা মানুষদের প্রধান ভরসা। সংঘর্ষ থামলে তারা নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবেন কি না, কিংবা সীমান্তে আশ্রয়ই দীর্ঘায়িত হবে কি না—সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী দিনগুলোতে মোয়ালের পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি দেখে।





