ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার মুখে আইসিসি পেল ইউরোপের সর্বোচ্চ মানবাধিকার পুরস্কার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আদালতটিকে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) তাদের সর্বোচ্চ মানবাধিকার পুরস্কারে ভূষিত করেছে। বৃহস্পতিবারের এই সাখারভ পুরস্কার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালটির জন্য এ মাসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
এর আগে এ মাসেই আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে তাঁর কাজের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ফলে একই মাসে আদালত-সংশ্লিষ্ট দুটি বড় স্বীকৃতি আইসিসিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
পুরস্কার ঘোষণা করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্তা মেৎসোলা বলেছেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এবং এই পুরস্কার আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখায় আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কাজকে স্বীকৃতি দেয়।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, পুরস্কারটি শুধু সম্মাননা নয়, একটি রাজনৈতিক বার্তাও।
আইসিসি ইউরোপীয় পার্লামেন্টকে এই সম্মানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে ‘এমন এক সময়ে, যখন আদালত ও এর কর্মকর্তারা নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি’। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পাওয়া স্বীকৃতিকে আদালত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখছে।
আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে বলেছেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে সাখারভ পুরস্কার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে—এটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং যাঁরা আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে কাজ করেন, তাঁদের ভূমিকাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে।’ তাঁর কথায় আদালতের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।
হেগভিত্তিক আইসিসি দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তু। ২০২৪ সালে আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। আইসিসি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ব্যক্তিদের বিচার করে।
ট্রাম্প প্রশাসন আদালতটিকে ‘ইটের পর ইট ভেঙে ফেলার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সম্প্রতি এর দৈনন্দিন কার্যক্রম পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে ছয় মাস বাকি থাকলেও আদালতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক ভিডিওতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, ‘আমরা এই দুর্বৃত্ত আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করব, তাদের সম্পদের উৎস কেটে দেব এবং আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করার সক্ষমতা পঙ্গু করে দেব—কারণ আমাদের বার্তা স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন জনগণ এই ভুয়া আইসিসির এখতিয়ারের অধীন নয়।’ ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন এই বক্তব্য।
ওয়াশিংটন আইসিসির বিচারক ও প্রসিকিউটরদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পাশাপাশি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের একজন বিশেষ প্রতিবেদক এবং আদালতে প্রমাণ সরবরাহ করা ফিলিস্তিনি অধিকার গোষ্ঠীগুলোও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগেই আইসিসির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং বলেছে, আদালত যাতে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে তারা ‘যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত’। পুরস্কার ঘোষণার পর ইইউ প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন অনলাইনে লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে, কোনো চাপ বা ভীতি প্রদর্শন ছাড়াই তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে।’
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগের এই বিলম্বকে ব্রাসেলস যুক্তরাষ্ট্রকে অবস্থান থেকে সরিয়ে আনার আলোচনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের আশা করছে। তবে ইইউ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিসিকে ওয়াশিংটনের হাত থেকে রক্ষা করতে একটি ‘ব্লকিং আইন’ কার্যকর করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সাখারভ পুরস্কার আইসিসি বনাম ওয়াশিংটনের টানাপোড়েনকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটিকে নিষেধাজ্ঞায় পঙ্গু করতে চাইছে, অন্যদিকে ইউরোপ সর্বোচ্চ মানবাধিকার সম্মাননা দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছে—আগামী ছয় মাসে এই দ্বন্দ্ব কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।






