লক্ষ্মীপুরে সারের ৫৭ ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতাকর্মী, অভিজ্ঞদের বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ ছয় উপজেলায় সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় প্রভাব খাটিয়েই তারা সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। বিষয়টি জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ডিলার হিসেবে মনোনীত বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনেকেরই সারের ব্যবসার কোনো অভিজ্ঞতা নেই বলে জানা গেছে।
বাদ পড়া অনেক আবেদনকারীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও তারা ডিলার হতে পারেননি। এতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাদের দাবি।
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। একই গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না; এক গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। নীতিমালায় আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরসহ ৫৮টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার জন্য সারের ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন। ওই সময় পর্যন্ত ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে।
৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের সই করা চিঠিতে ৫৭ জনকে সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা ডিলারদের ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিলারদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের কেউ বিএনপির পদে রয়েছেন, কেউ ছাত্রদল, যুবদল কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। এর বাইরে কয়েকজন দলের সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া দলীয় নেতাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন ব্যক্তিও আছেন কয়েকজন। তবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের তালিকায় এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতেও যুক্ত।
মেঘনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন কৃষিপ্রধান; যত দূর চোখ যায়, তত দূর ফসলের মাঠ। সয়াবিনসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হওয়ায় এই ইউনিয়নে সারের চাহিদাও বিপুল। ইউনিয়নটির সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ। তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সারের ব্যবসায় ছিল না বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে। একইভাবে রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও ডিলার হয়েছে, যার আগে সারের ব্যবসা ছিল না।
রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মেহেদী হাসান আইনান মনোনীত হয়েছেন; তিনি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। বামনী ইউনিয়নে মনোনীত আমির হোসেন ওরফে ছুটু বামনী ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে মনোনীত মো. মাসুদ মিয়া লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আর চরমোহনা ইউনিয়নে মনোনীত ফাহিম ভূঁইয়া ওই ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি। লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও একই চিত্র—মনোনীতদের মধ্যে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা এবং দলীয় নেতাদের আত্মীয়রা, যাদের অনেকেরই আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে জানা গেছে।
২০০২ সাল থেকে চন্দ্রগঞ্জ বাজারে সার বিক্রি করে আসছেন মো. শোভন। তিনি এবার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, তবে মনোনীতদের তালিকায় তার নাম নেই। মো. শোভন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। সব নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় ডিলার হতে পারলাম না।’ চর কাদিরা ইউনিয়নে এক যুগ ধরে সারের ব্যবসা করা শাহেদ হাওলাদারও বাদ পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসা থাকার বিষয়টি ছিল। আমি এক যুগ ধরে এলাকায় সারের ব্যবসা করছি। কিন্তু আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যিনি আগে কখনো সারের ব্যবসা করেননি। এটি দুঃখজনক ও হতাশাজনক।’
কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নে আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওরফে রকি। তাঁর দাবি, পৈতৃক সূত্রে তাদের পরিবার সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের সার ব্যবসার বয়স প্রায় ৫০ বছর; বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের ডিলারশিপ বাতিল হয়। এবার আবেদন করেও তিনি মনোনীত হননি। তারেক রহমান বলেন, ‘অযোগ্য ব্যক্তিদের সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের মনোনীত করা হয়েছে, তাদের গুদাম নেই। এমনকি অনেকেরই নেই সার বিক্রির অভিজ্ঞতা। এতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের বাণিজ্য করেছেন।
তবে ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘সারের ডিলার নিয়োগে দলীয়ভাবে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় ডিলার হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, তাদেরও প্রত্যাশা ছিল, নীতিমালা অনুযায়ী আগে থেকে যারা সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারাই ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার পাবেন। রায়পুরের দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের মনোনীত আমিনুল আজিজও রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যথাযথ কাগজপত্র জমা দিয়েই তিনি মনোনীত হয়েছেন, যদিও তিনি আগে কখনো সারের ব্যবসা করেননি। সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল বলেন, তাঁর ইউনিয়নে অন্য কেউ আবেদনই করেননি; তিনি একমাত্র আবেদনকারী ছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসানকে ফোন করা হয়। তিনি কল রিসিভ না করে বার্তা পাঠাতে বলেন। পরে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, তালিকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংখ্যা বেশি—এমন তথ্য তিনিও জানতে পেরেছেন। উপজেলা কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল; পরে সেই তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত তালিকা আসে। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমাদের দলের নেতাকর্মীরা সারের ডিলারসহ বিভিন্ন কিছু থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দল ক্ষমতায় আসার পর এখন অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিচ্ছেন। সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের কোনো প্রভাব ছিল না।’ এখন প্রশ্ন হলো, নীতিমালার অগ্রাধিকারের শর্ত মেনে এই তালিকা কতটা টেকে—সে উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন বাদ পড়া অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা ও কৃষকেরা।





