উগান্ডার বিমানবন্দরেই কি সংক্রমণ? নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার ইবোলা রোগীর পথ মিলেছিল এনটেবেতে, তদন্তে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা
নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার দুই ইবোলা রোগী চলতি মাসের শুরুতে উগান্ডার প্রধান বিমানবন্দরে পথ অতিক্রম করেছিলেন কি না — তা খতিয়ে দেখছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। দুজনই ৩ অক্টোবর এনটেব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন, আর তদন্তকারীরা দেখছেন, অভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার বা অন্য কোনো সংস্পর্শের মাধ্যমে তারা ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না। বৃহস্পতিবার আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটির জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া বিভাগের প্রধান ড. ওয়েসাম মানকৌলা বলেন, বিমানবন্দরে সংস্পর্শের ঘটনাটি ‘সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলোর একটি’ — তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখনো কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তার ভাষায়, ‘বর্তমানে আমরা যেসব বিষয় তদন্ত করছি, তার মধ্যে একটি হলো বিমানবন্দরে দুই রোগীর মধ্যে কোনো ধরনের মিথস্ক্রিয়া হয়েছিল কি না।’ তদন্তকারীরা দুটি সংক্রমণের অভিন্ন কোনো উৎস থাকতে পারে কি না, তাও পরীক্ষা করছেন।
নাইজেরিয়া এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশটির প্রথম ইবোলা আক্রান্তের মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে কেনিয়ায় এখন পর্যন্ত নয়জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন।
নাইজেরিয়ার রোগী ৪২ বছর বয়সী উগান্ডায় জন্ম নেওয়া এক নারী, যিনি আবুজায় বসবাস করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, তিনি আইসোলেশনে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং তার অবস্থার উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। রোগী নাইজেরিয়ায় অবস্থানরত এক সুইস কূটনীতিকের স্ত্রী — সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। উগান্ডা সফরে তার সঙ্গে যাওয়া স্বামীও আইসোলেশনে আছেন, তবে তার মধ্যে কোনো উপসর্গ দেখা দেয়নি।
ওই নারী উগান্ডায় প্রায় আড়াই সপ্তাহ কাটিয়ে ৩ অক্টোবর নাইজেরিয়ায় ফেরেন; পথে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় তার দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি ছিল। আবুজায় পৌঁছানোর চার দিন পর তার মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর দুটি বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার পর ২০ অক্টোবর তার ইবোলা পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে।
কর্মকর্তারা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন, তিনি কোথায় ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন এবং কেনিয়ার রোগীর চলাচলের সঙ্গে তার চলাচল মিলেছিল কি না। কেনিয়ার ওই পুরুষ রোগী গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) থেকে উগান্ডা হয়ে ৩ অক্টোবর নাইরোবিতে পৌঁছেছিলেন। পরে তিনি মারা যান — চলতি প্রাদুর্ভাবে কেনিয়ায় এটিই প্রথম নথিভুক্ত ইবোলা মৃত্যু।
দুজনই একই দিনে এনটেব বিমানবন্দর দিয়ে গেলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি যে তাদের দেখা হয়েছিল, তারা একই সুবিধা ব্যবহার করেছিলেন, কিংবা অন্য কোনো সংস্পর্শে এসেছিলেন।
ডব্লিউএইচও বলেছে, নাইজেরিয়ার ওই নারী কোথায় সংক্রমিত হয়েছেন তা নির্ধারণের সময় এখনো আসেনি। সংস্থাটির জরুরি প্রতিক্রিয়া কর্মকর্তা ড. প্যাট্রিক ওটিম বলেন, ‘সংস্পর্শের উৎস এখনো জানা যায়নি। রোগীর ভ্রমণ ইতিহাস এখনো টুকরো টুকরো করে সাজানো হচ্ছে।’ হাসপাতালে থাকায় রোগীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় তার চলাচলের সম্পূর্ণ বিবরণ পেতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাইজেরিয়ার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (এনসিডিসি) জানিয়েছে, তারা জিনোম সিকোয়েন্সিং করছে, যা থেকে বোঝা যেতে পারে এই সংক্রমণ অন্য ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কি না। ডব্লিউএইচওর নাইজেরিয়া প্রতিনিধি ড. পাভেল উরসু বলেন, ‘তদন্তে সম্পূর্ণ ভ্রমণ ও সংস্পর্শের ইতিহাস পুনর্গঠন করা হচ্ছে। জিনোম সিকোয়েন্সিংকে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, রোগী উচ্চমানের চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং তার অবস্থা স্থিতিশীল।
এর আগে উগান্ডার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ওই নারী ব্যবসায়িক কাজে পূর্ব ডিআর কঙ্গোতে গিয়েছিলেন — যেখানে চলতি ইবোলা প্রাদুর্ভাবের শুরু। তবে ডব্লিউএইচও, আফ্রিকা সিডিসি ও নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিনি ডিআর কঙ্গোতে গিয়েছিলেন — এমন যাচাইকৃত তথ্য তারা পায়নি। উগান্ডা বরাবরই বলে আসছে, দেশটিতে কোনো নিশ্চিত সক্রিয় ইবোলা রোগী নেই, এবং ওই নারীর দেশটি দিয়ে যাতায়াত মানেই তিনি সেখানেই সংক্রমিত হয়েছেন — এমনটা নয়।
এদিকে আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, নাইজেরিয়া ওই নারীর সংস্পর্শে আসতে পারে এমন আরও লোকজনকে শনাক্ত করেছে — শুরুতে জানানো ৪৪ জন সংস্পর্শের বাইরেও। মানকৌলা বলেন, ‘ওই সংস্পর্শদের বেশিরভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মী, যেখানে এই রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যও কয়েকজন আছেন।’ উচ্চ ঝুঁকিতে থাকাদের শনাক্ত করে কোয়ারেন্টিনে নেওয়ার কাজ চলছে; তবে সরকারের ফলাফল প্রকাশের আগে তিনি হালনাগাদ সংখ্যা দিতে রাজি হননি।
কেনিয়ায় সম্ভাব্য সংস্পর্শের কারণে কোয়ারেন্টিনে থাকা প্রথম দলটির সদস্যরা উপসর্গ ছাড়াই ২১ দিনের পর্যবেক্ষণ শেষ করে রোববার থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করবেন। দেশটির স্বাস্থ্য মহাপরিচালক ড. প্যাট্রিক আমোথ বলেন, নিশ্চিত হওয়া নয়টি সংক্রমণই প্রথম রোগীর সঙ্গে যুক্ত, ব্যাপক সামাজিক সংক্রমণের (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) কোনো প্রমাণ নেই। তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘আমরা এখনো বিপদমুক্ত নই’ — জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি। বাকি আটজন রোগী আইসোলেশনে আছেন এবং চিকিৎসায় ভালো সাড়া দিচ্ছেন।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমিত ব্যক্তিদের চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে — বিশেষ করে ডিআর কঙ্গো ও প্রতিবেশী উগান্ডার মধ্যে, যেখানে বাণিজ্য, কাজ ও পারিবারিক কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। ড. ওটিম সতর্ক করেন, দুই দেশের দীর্ঘ ও ছিদ্রবহুল (পোরাস) সীমান্তে সবাইকে পরীক্ষা করা কঠিন, কারণ অনেকেই অনানুষ্ঠানিক পথ ব্যবহার করেন। ডব্লিউএইচওর আফ্রিকা আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহামেদ জানাবি ‘আঞ্চলিক সতর্কতার’ আহ্বান জানিয়ে দেশগুলোকে নজরদারি শক্তিশালী করা, সংক্রমণ তদন্ত করা এবং সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার তাগিদ দিয়েছেন।
ইবোলা একটি গুরুতর ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে, কিংবা দূষিত বস্তুর মাধ্যমে ছড়ায়; এটি ফ্লুর মতো বাতাসে ছড়ায় না। ভাইরাসটি জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, বমি ও ডায়রিয়া ঘটাতে পারে এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সংক্রামক ধরা হয় না। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, সংস্পর্শদের দ্রুত শনাক্ত করা, সন্দেহভাজনদের আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসা দেওয়াই আরও সংক্রমণ ঠেকানোর মূল চাবিকাঠি — এনটেবের তদন্তের ফল সেই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।






