আফগানিস্তানে উচ্চশিক্ষায় শুধু নারী নয়, কমেছে পুরুষ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকও: জাতিসংঘের প্রতিবেদন
আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা যে কতটা সংকুচিত হয়েছে, তা উঠে এসেছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ও শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার এক নতুন প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। একই সময়ে নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিক্ষকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
‘আফগানিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশটির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩ লাখ ৬ হাজার পুরুষ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিলেন। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজারে। সাত বছরে প্রায় এক লাখ পুরুষ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার বাইরে চলে গেছেন।
নারীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও করুণ। ২০১৯ সালে দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার নারী উচ্চশিক্ষায় নিবন্ধিত ছিলেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৮৯ হাজারে। ২০২৩ সালে তা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো নারী শিক্ষার্থীর নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই পতনের পেছনের প্রেক্ষাপট জানা। ২০২১ সালে নতুন করে ক্ষমতায় আসার পর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে দেশটির নারীরা আনুষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যার প্রতিফলনই ধারাবাহিক এই সংখ্যাগুলোতে দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনটি জোর দিয়ে বলছে, আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সংকোচন শুধু নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরুষ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা পুরো ব্যবস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
পুরুষ শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে প্রতিবেদনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থনৈতিক দুরবস্থা। ডিগ্রি নিলেও চাকরি মিলবে কি না — এই অনিশ্চয়তা অনেক পরিবারকেই বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হতে নিরুৎসাহিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংকটের সম্মিলিত প্রভাব দেশটির উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করছে। আর্থিক চাপে পড়া পরিবারগুলো পড়াশোনার বদলে উপার্জনকেই অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে।
শিক্ষকসংখ্যার পতনও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে আফগানিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১৮ হাজার ৯০০ জন অধ্যাপক ও প্রভাষক কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৭০০-তে। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে শিক্ষকসংখ্যা কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই হ্রাস আরও অনেক বেশি। ২০১৯ সালে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন নারী অধ্যাপক ও প্রভাষক ছিলেন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা কমে প্রায় ১ হাজার ১০০-তে দাঁড়ায়, ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ৮০০-তে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১০০ জনের সামান্য বেশি।
জাতিসংঘের দুই সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, উচ্চশিক্ষা থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। নারী চিকিৎসক, নারী শিক্ষক ও নারী গবেষকের ধারা ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে ২০৬৬ সাল নাগাদ আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাটি। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশটির প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি আঘাত।
প্রতিবেদনে দেশটির ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নারীদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ ও যোগ্য পেশাজীবীর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে পুরুষ শিক্ষার্থী কমতে থাকায় সেই ঘাটতি পূরণের বিকল্প পথও সংকীর্ণ হচ্ছে।
শিক্ষার্থী ভর্তি ও শিক্ষকসংখ্যা — উভয় ক্ষেত্রেই এই পতন আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক কমে যাওয়ায় শিক্ষার মান বজায় রাখা, দক্ষ পেশাজীবী তৈরি এবং ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।





