ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আনা হিস্পানিক ভোটাররাই এখন মুখ ফেরাচ্ছেন টেক্সাসে
টেক্সাসের রিও গ্রান্দে উপত্যকায় ভোরের আলো ফোটার আগেই ছোট্ট লা লোমিতা ক্যাথলিক চ্যাপেলে প্রার্থনার জন্য জড়ো হচ্ছিলেন মানুষ। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা রঙের এই ভবনটি রিও গ্রান্দে নদী থেকে মাত্র প্রায় ২০০ গজ দূরে।
এই চ্যাপেলের যাজক ফাদার রয় স্নাইপস প্রায় অর্ধশতক ধরে এখানে আছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘কাউবয় প্রিস্ট’ নামে পরিচিত, কারণ যাজকের প্রচলিত টুপির বদলে তিনি পরেন স্টেটসন। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তিনি চ্যাপেলের জমি নিয়ে সীমান্ত দেয়াল তৈরির পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন।
এবার শুক্রবারের ভোরের প্রার্থনায় তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর কর্মকাণ্ড। প্রায় ৩০ জন, মূলত হিস্পানিক উপাসকের সামনে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দরিদ্র ও ভালো মানুষদের আটক, বন্দি ও বহিষ্কার করার কোনো ভালো অজুহাত নেই।
ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের মাধ্যমে পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে আইসিইর মোট গ্রেপ্তারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয়েছিল টেক্সাসে, যা অন্য যেকোনো অঙ্গরাজ্যের চেয়ে বেশি। এই পরিসংখ্যান সীমান্ত এলাকার মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ফাদার স্নাইপস তার বক্তব্যে বলেন, বলা হয়েছিল সবচেয়ে খারাপ অপরাধীদের খুঁজে বের করে আটক ও বহিষ্কার করা হবে। সীমান্তে কার্টেলই সবচেয়ে খারাপ বলে তারা ভেবেছিলেন সেটা ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রায় প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে, কাজে যাওয়ার পথে কোনো সাধারণ মানুষকে থামিয়ে আটক করা হচ্ছে।
প্রার্থনার পর দুজন শিক্ষক জানান, তাদের অনেক শিক্ষার্থীকে ফিরে যেতে হচ্ছে, কারণ তাদের বাবা-মাকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। তাদের একজনের বন্ধু বলেন, তারা যে নিষ্ঠুরতা দেখছেন, সেটাই হয়তো জোয়ার ঘুরিয়ে দিচ্ছে, অন্তত তিনি তা-ই আশা করেন।
আসলে রাজনৈতিক জোয়ার ঘোরানোই ডেমোক্র্যাটদের আশা। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাসে তারা এই পরিবর্তন কাজে লাগাতে চায়। তবে কাজটি সহজ হবে না।
এই রিও গ্রান্দে এলাকা একসময় যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের সবচেয়ে ব্যস্ত পারাপার পয়েন্টগুলোর একটি ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় লাখ লাখ অভিবাসী এখান দিয়ে এসেছেন, এক বছরে ২৫ লাখের বেশি আটকের ঘটনা রেকর্ড হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে এই অবৈধ পারাপার বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং বড় অংশে তিনি তা রক্ষা করেছেন। সীমান্ত পারাপার এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই প্রতিশ্রুতিই আংশিকভাবে টেক্সাসে ট্রাম্পের বিস্ময়কর সমর্থন এনে দিয়েছিল; তিনি শুধু টেক্সাসেই হিস্পানিক ভোটের প্রায় ৫৫ শতাংশ পেয়েছিলেন, যা একজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য রেকর্ড।
রিও গ্রান্দে উপত্যকার অন্যতম বড় শহর ম্যাকঅ্যালেনের রিপাবলিকান মেয়র হাভিয়ের ভিলালোবোস মনে করেন, এবার রিপাবলিকানদের জন্য সময়টা কঠিন হবে। তবে সীমান্ত সমস্যা দমনে ট্রাম্প প্রশাসনকে কৃতিত্বও দেন তিনি। তিনি বলেন, সাধারণভাবে বেশিরভাগ মানুষ অপরাধী, সহিংস বা একেবারে অনুৎপাদনশীল মানুষদের বহিষ্কারে আপত্তি করে না, কিন্তু উৎপাদনশীল ও আইন মান্যকারী মানুষদের বহিষ্কার শুরু হলেই সমস্যা তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, ২০২৪ সালের পর থেকে হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন অনেকটাই কমে গেছে। গ্রীষ্মের শেষ দিক থেকে করা জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, টেক্সাসের হিস্পানিক ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ প্রেসিডেন্টের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তারা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে রাখছেন।
মারিও গেরেরো নামের এক তরুণ মেক্সিকান-আমেরিকান ব্যবসায়ী, যিনি সাউথ টেক্সাস বিল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দেন, টানা তিনবার ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার নভেম্বরে তিনি ডেমোক্র্যাটকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, বাইডেনের সময় অভিবাসনের ঢল দেখে তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন; তারা ভেবেছিলেন সীমান্ত সংকট ঠিক করা হবে। কিন্তু তাদের বলা হয়নি, একটি বার্তা দেওয়ার জন্য প্রশাসন কতটা চরম পথে যেতে রাজি।
গেরেরো একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে গত বছর প্রতিদিন ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করতেন; এখন দুই দিন আগে তিনি জানিয়েছেন, চার থেকে ছয়জন শ্রমিক কাজে এলে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবেন। অভিবাসন কড়াকড়ির সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় শ্রমবাজারে।
তবু গেরেরো নিজেকে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান কোনোটাই মনে করেন না। হিস্পানিক ভোটার বিশেষজ্ঞ ও শীর্ষ রিপাবলিকান পরামর্শক মাইক মাদ্রিদের মতে এটাই মূল বিষয়: অন্য যেকোনো জাতিগত গোষ্ঠীর তুলনায় লাতিনোরা নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী।
হিস্পানিক ভোটাররা স্থায়ীভাবে রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকছে—এই বিশ্বাস থেকেই ট্রাম্প টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোকে দশকভিত্তিক জনশুমারির আগেই কংগ্রেসের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে চাপ দিয়েছিলেন। টেক্সাসের ১৫তম কংগ্রেস আসনটি নতুন করে আঁকার পর ধারণাগতভাবে রিপাবলিকানদের ১৮ পয়েন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলেও বর্তমান জরিপে ডেমোক্র্যাটরা পাঁচ-ছয় পয়েন্টে এগিয়ে আছেন বলে দেখা যাচ্ছে।
সেই আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ববি পুলিদো, জনপ্রিয় তেহানো গায়ক ও দুটি লাতিন গ্র্যামি জয়ী, যিনি রিও গ্রান্দে উপত্যকায় ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। তিনি জাতীয় ডেমোক্র্যাট ব্র্যান্ড থেকে নিজেকে দূরে রেখে ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। তার ভাষায়, এটা নিউইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেস নয়; মানুষ সবার আগে অর্থনীতির কথাই শুনতে চায়।
একটি স্থানীয় অ্যাভোকাডো উৎসবে ডেভ বাল্ডউইন ও ভেরোনিকা সালাজার দম্পতি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করতেই দাম বাড়ার কথা তোলেন। দাম বাড়ার জন্য কাকে দায়ী করেন জানতে চাইলে তাদের জবাব ছিল দ্রুত: প্রেসিডেন্টকে। বাল্ডউইন বলেন, এসবের ক্ষেত্রে আমাদের ভাগ্য তার নিয়ন্ত্রণে, আর এখন তিনি খুব ভালো কাজ করছেন না।
রিপাবলিকান প্রচারকদের অনেকের মধ্যেই ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে পিছিয়ে থাকার অনুভূতি রয়েছে। শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক আলেক্সিস উসকাঙ্গা বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন আসলে ভোটার উপস্থিতির খেলা; কাউকে বোঝানোর চেয়ে নিজেদের মানুষদের ভোটকেন্দ্রে আনাই মূল কাজ। ৩ নভেম্বর টেক্সাসের হিস্পানিক ভোটই তাই ঠিক করে দিতে পারে, মানচিত্র বদলে দেওয়ার কৌশল কাজ করল কি না।






