জাতিসংঘ মহাসচিবের দৌড়ে নির্ণায়ক পর্ব, নতুন প্রার্থী লানা নুসেইবের আগমনে জমে উঠেছে লড়াই
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের দৌড় চূড়ান্ত পর্বে প্রবেশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের তারকা কূটনীতিক লানা নুসেইবে এই দৌড়ে নেমেছেন, যা বিশ্ব সংস্থাটির ভবিষ্যতের জন্য নির্ণায়ক এক সময়ে অগ্রগণ্য প্রার্থী রেবেকা গ্রিনস্পানকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
জাতিসংঘের ৮০ বছরেরও বেশি ইতিহাসে কখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি। এবার একজন নারী মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও এই দৌড় ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে।
জটিল নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তাদের এক অনানুষ্ঠানিক স্ট্র পোলে গ্রিনস্পান তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট এবং আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি।
কিন্তু দুটি বিরোধী ভোট পাওয়ার পর দৌড়টি আবার নতুন করে খুলে গেছে, যাতে নতুন প্রার্থীরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিজয়ীকে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে কমপক্ষে নয়টি ভোট পেতে হবে এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া—কারও বিরোধিতা থাকা চলবে না। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বেছে নিতে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত সময় রয়েছে পরিষদের; এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ নিয়োগ নিশ্চিত করবে।
গ্রিনস্পান, গ্রোসি ও রদ্রিগেস-বার্কেটের পাশাপাশি প্রচারণায় রয়েছেন ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল, উগান্ডার সাবেক জাতিসংঘ আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল ওলারা ওতুনু এবং ইকুয়েডরের কূটনীতিক ইভোন আ-বাকি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিমন্ত্রী লানা নুসেইবে এই সপ্তাহে তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণা করে দৌড়ে নতুন প্রাণ এনেছেন। শান্তির জন্য ‘নীরব কূটনীতি’ এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার জায়গা তৈরিতে তাঁর বহুমুখী ভূমিকার জন্য তিনি পরিচিত।
প্রার্থিতা শুরু করে নুসেইবে বলেন, ‘আমার পেশাজীবনের বড় অংশ কেটেছে জাতিসংঘে এবং এর আশপাশে কাজ করে, এবং আমি নিজ চোখে দেখেছি দৃঢ় কূটনীতি কী অর্জন করতে পারে—গভীর মতভেদ থাকা দেশগুলো অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে পায়, এবং যেখানে মানুষ বলেছিল সমঝোতা অসম্ভব, সেখানেও সমঝোতা হয়।’
তাঁর ভিশন বিবৃতিতে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তাকে কেন্দ্রে রেখেছেন; পাশাপাশি উন্নয়ন ও মানবাধিকারে সার্বিকভাবে ফল দেওয়ার এবং মনোযোগ ও ফলাফলকে ঘিরে সংস্থাটির সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নুসেইবে বলেন, ‘আমি মহাসচিব পদে দাঁড়াচ্ছি কারণ আমি বিশ্বাস করি এটি আরও জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার মুহূর্ত: আগে থেকে কাজ করা, মতভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে একত্র করা এবং কাজকে এগিয়ে নেওয়া—যতক্ষণ না তা সুনির্দিষ্ট ফল দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই পদের জন্য নিজেকে সেভাবেই উপস্থাপন করতে চাই, যেভাবে আমি দায়িত্ব পালন করব: প্রতিটি সরকারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলব এবং কারও কাছে জবাবদিহি করব না।’
সুপরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে আবুধাবি ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা ৪৮ বছর বয়সী নুসেইবে আগে জাতিসংঘে আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং সে সময় দেশটির মর্যাদা বাড়ানোর কৃতিত্ব তাঁর। নিরাপত্তা পরিষদে আসনের জন্য আমিরাতের সফল প্রচেষ্টার নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি।
দেশটির ২০২২ থেকে ২০২৩ মেয়াদে নুসেইবে প্রস্তাব ২৭২০ গৃহীত হওয়া নিশ্চিত করেন, যা গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খুলে দেয়। হিব্রু ভাষায় কথা বলতে পারা নুসেইবে জানান, রাফা সীমান্ত ক্রসিংয়ে পরিষদ সদস্যদের সফরের ব্যবস্থা করে তিনি প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন আদায় করেন।
সফল হলে নুসেইবে হবেন ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর জাতিসংঘের প্রথম নারী প্রধান, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রথম মহাসচিব এবং মিশরের বুতরোস বুতরোস-ঘালির পর আরবি ভাষাভাষী বিশ্ব থেকে দ্বিতীয় মহাসচিব।
নুসেইবে বুধবার বলেন, ‘আমি মনে করি পরবর্তী মহাসচিব একজন নারী হলে দারুণ হবে, কিন্তু আমি নারী বলে দাঁড়াচ্ছি না; আমি দাঁড়াচ্ছি কারণ আমি জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী এবং আমি বিশ্বাস করি দরজা খোলার জন্য কূটনীতির পেছনে অবিচল থাকা একজন মানুষ আমাদের প্রয়োজন।’
অন্যদিকে ৭০ বছর বয়সী কোস্টা রিকার সাবেক উপরাষ্ট্রপতি রেবেকা গ্রিনস্পান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পোল্যান্ড থেকে পালিয়ে আসা ইহুদি বাবা-মায়ের সন্তান। মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্পান বলেন, ‘আমি ঠিক জানি যুদ্ধ আপনার কাছ থেকে কী কেড়ে নেয় এবং শান্তি আপনাকে কী করতে দেয়।’ বর্তমানে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের মহাসচিব গ্রিনস্পান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গঠনমূলক’ সমালোচনার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, জাতিসংঘের বিপুল সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তা তার সম্ভাবনা অনুযায়ী কাজ করছে না—একটি সংস্কারপ্রাপ্ত জাতিসংঘই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
ডিসেম্বরের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় এখন সবার নজর নিরাপত্তা পরিষদের দিকে। নতুন প্রার্থীর আগমনে জমে ওঠা এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে গুতেরেসের উত্তরসূরি হন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।






