জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের তদন্তে অগ্রগতি নেই, ডিভাইস পায়নি পুলিশ

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনার তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির কাছে ওই অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়েছে এবং বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছেও তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিছু ডিভাইসের ফরেনসিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শফিকুর রহমানের মোবাইল ফোন ও ডিভাইস এখনো হাতে পাননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের দাবি, ডিভাইস হাতে না পাওয়ায় তদন্তে অগ্রগতি নেই এবং হ্যাকের রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
গত ৩১ জানুয়ারি জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডল হ্যাক হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট।
ডিএমপির গোয়েন্দা-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) উপকমিশনার মো. তরিকুল ইসলাম গত মঙ্গলবার বলেন, জামায়াতের আমিরের ডিভাইসগুলো না পাওয়ায় সেগুলোর ফরেনসিক করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, তদন্তটি সমন্বিত হওয়ার জন্য সব বিষয়ের তথ্য দরকার। সবকিছুর প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে আসল সত্য জানা যাবে।
মামলাটি করেন দলটির জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ২০২৬-এর সদস্য ও ক্যাম্পেইন ডিভিশনের সমন্বয়ক মো. সিরাজুল ইসলাম। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জন কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে ডা. শফিকুর রহমানের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেন। পরে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে নারীবিদ্বেষী, অশ্লীল ও উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়, যা জাতিগত সহিংসতা, ঘৃণা ও দাঙ্গা ছড়াতে পারে বলে অভিযোগে বলা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যাকাউন্ট হ্যাকের বিষয়ে তথ্য চেয়ে এক্স কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত তথ্য পেতে হলে দুই দেশের আদালতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এতে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মামলার তদন্তে ডিভাইস ও অন্যান্য আলামত জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা জরুরি। এ জন্য তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রেজাউল আমীন মামলার বাদী সিরাজুল ইসলামকে চারবার চিঠি দিয়ে ডিভাইসসহ অন্যান্য আলামত চেয়েছেন। তবে সেগুলো জমা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে ডিবি।
এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর এজিবি কলোনির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। সেগুলো ফরেনসিক করতে সিআইডিতে দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো সেগুলোর প্রতিবেদন পায়নি তদন্তকারী সংস্থা।
গ্রেপ্তারের দুদিন পর আদালত থেকে জামিন পান ছরওয়ারে আলম। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এর কিছুই জানেন না। তারপরও মামলার আসামি হয়েছেন। সঠিক তদন্ত হলে এর সত্য বের হয়ে আসবে বলে তিনি জানান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা গত মঙ্গলবার বলেন, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের ওই কর্মীর ডিভাইস চাওয়া মাত্র পুলিশ পেয়েছে। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। একটি ডিভাইসের প্রতিবেদন এলেই এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। তাই জামায়াতের আমিরের ডিভাইসগুলোরও ফরেনসিক করতে হবে।
ডিভাইস না দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আমিরের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিন আগের ঘটনা, তাঁর এখন বিষয়টি মনে নেই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের কোনো ই-মেইলের কারণে অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। জামায়াতের কাছে ওই ই-মেইল পৌঁছেছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য-প্রমাণও মেলেনি। এজাহারের সঙ্গে যুক্ত স্ক্রিনশট ছাড়া এ বিষয়ে অন্য কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
বাদী ও ভুক্তভোগীর ডিভাইস যদি তদন্ত কর্মকর্তাকে না দেওয়া হয়, তাহলে এই মামলার তদন্তে অগ্রগতি হবে না বলে মনে করেন সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল ফরেনসিক গবেষক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ডিভাইস দিতে যত দেরি হবে, তত আলামত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একসময় কোনো কিছুই পাওয়া যাবে না।
মামলার বাদী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে তাঁরা (ডিবি) যে ডিভাইসগুলো চেয়েছে, সেগুলো দেওয়ার বিষয়ে আমরা এরই মধ্যে দুবার ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ডিভাইসগুলো কী প্রক্রিয়ায় দেওয়া যায় এবং সেগুলোর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’




