শনিবারের সহিংসতার আশঙ্কায় ফ্রান্সজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ: প্যারিসের কাছে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী হামলায় বাড়ল উত্তেজনা
আরেকটি সপ্তাহান্তের সহিংস বিক্ষোভ ঠেকাতে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ৭০ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে, সঙ্গে থাকছে হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামান। এর মধ্যে শুক্রবার প্যারিসের কাছে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা দেশজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকার সহিংসতা এড়াতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মাখোঁ আগামী সপ্তাহে নাইজেরিয়া ও সেনেগালে তাঁর পরিকল্পিত সফর বাতিল করেছেন। সপ্তাহান্তের আগে তিনি বলেন, ‘আগামী দিনগুলোর জন্য গৃহীত কৌশল হলো, বৈধ কর্তৃত্ব নেই এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আবেদন করা বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিয়মগুলো সহজ, এবং আমার মনে হয় এগুলো সাধারণ বোধের বিষয়। সাধারণ সুপারিশ হলো, আগামী দিনগুলোতে কোনো বিক্ষোভ হওয়া উচিত নয়।’
মাখোঁ জানান, শ্রমিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভের আবেদন জমা দিলে প্রিফেক্টরা আইন অনুযায়ী সেগুলো পরীক্ষা করবেন, তবে শহরের কেন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবন রক্ষায় বিকল্প পথের প্রস্তাব দেওয়া হবে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে প্যারিসের পশ্চিমে ট্রাপ শহরের ঘটনা। সেখানে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ; ওই ঘটনায় একজন নিহত ও ১২ বছর বয়সী এক মেয়েসহ চারজন আহত হয়েছেন। প্রথমে ঘটনাটিকে ‘তুলনামূলক এলোমেলো’ গুলি বলা হলেও এএফপি জানায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি গাড়ি থেকে এলোমেলোভাবে গুলি চালিয়েছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। শহরের মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, নিহত ব্যক্তি ও আহতদের অন্তত একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ নুনিয়েজ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘উদ্দেশ্য বর্ণবাদী হতে পারে। তদন্ত চলছে, তবে এটি স্পষ্টতই একটি সন্ত্রাসী অপরাধ।’ মাখোঁ বলেন, এই ‘ভয়াবহ দুর্ভোগে’ জাতি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছে।
গত সপ্তাহান্তের অস্থিরতায় পুলিশ ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’ বলে স্বীকার করার পর নুনিয়েজ বলেন, তাঁর মন্ত্রণালয় আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা অত্যন্ত সতর্ক থাকব, অত্যন্ত কঠোর থাকব, এবং একেবারে কিছুই ছাড় দেব না।’
এদিকে ফ্রান্সের অন্যতম প্রাচীন ছাত্র সংগঠন ইউনিয়ন নাসিওনাল দে এতুদিয়াঁ দ্য ফ্রান্স (ইউএনইএফ) জানিয়েছে, পুলিশ তাদের অনুমতির আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও তাদের পরিকল্পিত সমাবেশ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই হবে। পুলিশ এখন পর্যন্ত প্যারিসে শুধু একটি শ্রমিক সংগঠনের বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে, ইউএনইএফ ও ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
সহিংসতার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের দিকেও আঙুল তুলেছেন মাখোঁ। তিনি বলেন, ‘গত শনিবার আমরা অতি-বাম গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ড দেখেছি, যাদের লক্ষ্য প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করা।’ তাঁর এই মন্তব্যে বিক্ষোভ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
আলিয়ঁস পুলিস নাসিওনাল ইউনিয়নের মহাসচিব ফাবিয়ান ভানহেমেলরিক চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দায়ী করে বলেন, যারা অমার্জনীয় বিষয়কে মার্জনা করেন, সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেন এবং আক্রমণকারীদের নিন্দা করার বদলে পুলিশ সদস্যদের ওপর দোষ চাপাতে পছন্দ করেন, তাঁরাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্র ক্রমবর্ধমান নির্লজ্জ সহিংসতার মুখে পুলিশ সদস্যদের পরিত্যাগ করেছে, অথচ তাদের চুপ থেকে অবস্থান ধরে রাখতে বলছে।
শনিবারের পরিকল্পিত বিক্ষোভের আগে লুভর ও মিউজে দ’অর্সের মতো বড় ফরাসি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হচ্ছে, প্যারিসজুড়ে ২৪টি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ থাকবে। রাজধানীর পার্ক দে প্রাঁসে রোববার রাতে অনুষ্ঠেয় প্যারিস সাঁ-জেরমাঁ ও অলিম্পিক লিওনের লিগ ওয়ান ফুটবল ম্যাচটি পিছিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় নেওয়া হয়েছে।
তবে মধ্য প্যারিসের ঠিক উত্তরে স্তাদ দ্য ফ্রান্সে রোববার বিকেলে পিটসবার্গ স্টিলার্স ও নিউ অরলিন্স সেন্টসের এনএফএল ম্যাচটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই হওয়ার কথা রয়েছে, যদিও ম্যাচ ঘিরে সপ্তাহান্তের কিছু আয়োজন বাতিল করা হয়েছে।
স্তাদ দ্য ফ্রান্স সেই একই স্টেডিয়াম, যেখানে ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার রাতে ফ্রান্স ও জার্মানির আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ চলছিল; স্টেডিয়ামের বাইরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ মাঠে উপস্থিত ছিলেন এবং প্যারিসজুড়ে হামলার পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষের কাজ চলার সময় সমর্থকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেডিয়ামের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো তাজা বলেই শনিবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঘিরে সতর্কতা এতটা কড়া।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে গত ১৭ অক্টোবর প্যারিসে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক পুলিশ মোতায়েনের ঘটনা ঘটেছিল। শনিবার সেই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর।





