এআই যুগে ‘আসল’ প্রমাণে ইচ্ছে করেই রাখা হলো ঘোলাটে দৃশ্য: আসছে ডেভিড অ্যাটেনবরোর ‘ব্লু প্ল্যানেট থ্রি’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নকল ভিডিওর যুগে দর্শকদের আশ্বস্ত করতে অভিনব পথ বেছে নিয়েছে বিবিসি। তাদের বিখ্যাত প্রকৃতিবিষয়ক ধারাবাহিক ‘ব্লু প্ল্যানেট থ্রি’-তে ইচ্ছে করেই তুলনামূলক ঘোলাটে ও কম নিখুঁত ফুটেজ রাখা হয়েছে, যাতে দর্শকেরা বুঝতে পারেন—পর্দার প্রাণীগুলো এআই দিয়ে বানানো নয়, একদম আসল।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর ধারাভাষ্যে এই ধারাবাহিকের নির্মাতারা বলেছেন, এআই নকল ঠেকাতে এবং সিরিজের ‘সত্যতা’ (অথেনটিসিটি) প্রমাণ করতেই তাঁরা আরও ‘জৈবিক’ (অর্গানিক) শট অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
‘ব্লু প্ল্যানেট টু’ প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে আলো ফেলার প্রায় এক দশক পর, আর প্রথম ‘ব্লু প্ল্যানেট’ প্রচারের ২৫ বছর পর, বিবিসির জনপ্রিয় এই সিরিজ ফিরছে আরও নতুন প্রাণী-আচরণ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে—যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রথম পানির নিচের সিসিটিভি ক্যামেরা, যার ডাকনাম ‘স্টোনফিশ’ ক্যাম।
প্রথম ব্লু প্ল্যানেটের পর থেকে টেলিভিশন ও ক্যামেরা প্রযুক্তি বিকশিত হয়ে দর্শকদের আরও তীক্ষ্ণ, হাই-ডেফিনিশন ছবি দিচ্ছে। কিন্তু এআইয়ের উত্থান এবং বিবিসি স্টুডিওসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি ইউনিটের ধারণ করা অসাধারণ দৃশ্য ও বিস্ময়কর প্রাণীদের সমন্বয়ে নির্মাতারাই বেছে নিয়েছেন কম পালিশ করা শট—দেখাতে যে প্রাণীগুলো এআই-নির্মিত নয়।
নির্বাহী প্রযোজক এলিজাবেথ হোয়াইট বলেছেন, এআই “আমাদের আরও বেশি সত্য হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে।” তাঁর ভাষায়, গভীর সাগরে চিত্রিত প্রাণীগুলো “সম্ভবত এআই যা কল্পনা করতে পারে তার চেয়েও বিস্ময়কর—এবং এটা সম্পূর্ণ আসল।”
তিনি বলেন, অতীতে পানিতে প্লাংকটন ও নানা ভাসমান বস্তু থাকলে সেসব দৃশ্য সাধারণত বাদ দেওয়া হতো; এমনকি দৃশ্যে নৌকা বা বয়া চলে এলে সেটি ফ্রেমের বাইরে রাখা হতো, কিংবা বলা হতো পানির অবস্থা যথেষ্ট ভালো নয়। কিন্তু এখন এগুলো রেখেই দেওয়া হচ্ছে—“আমরা আসলেই সেই সত্যতার দিকেই ঝুঁকছি... এআই যত ছড়িয়ে পড়বে, আমরা সম্ভবত আরও বেশি ঘোলাটে, কম পালিশ করা ফুটেজের দিকে ঝুঁকব।”
বিবিসির স্পেশালিস্ট ফ্যাকচুয়াল কমিশনিং প্রধান জ্যাক বুটল একটি প্রেস স্ক্রিনিংয়ে সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে প্রথমবারের মতো বলেন, “এই সিরিজে কোনো জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা হয়নি। এক ফ্রেমও নয়। সবই আসল ফটোগ্রাফি।”
বুটল আরও বলেন, আমরা এখন “প্রকৃতির ইতিহাস নির্মাণের স্বর্ণযুগে” বাস করছি; কখনো কখনো মানুষের মনে হয় তারা সবকিছু আগেই দেখে ফেলেছে—“কিন্তু এই সিরিজ নতুন নতুন আচরণে ভরপুর।”
এর মধ্যে রয়েছে আগে কখনো না দেখা একটি দৃশ্য: ডলফিনেরা সামুদ্রিক স্পঞ্জ ব্যবহার করে প্রবালের গর্ত আটকে মাছ ফাঁদে ফেলছে—যা ধরা পড়েছে পানির নিচের সিসিটিভি ক্যামেরায়, যেটি তৈরি করেছেন অনুষ্ঠানের প্রযোজক ও পরিচালক ইয়োলান্ড বোসিগার।
সিরিজ প্রযোজক লারা বিকারটন জানান, পাঁচ মহাসাগরজুড়ে চার বছর ধরে চলা চিত্রগ্রহণে বিবিসি স্টুডিওস ‘ক্রমাগত উদ্ভাবন’ করেছে—অক্টোপাসকে অনুসরণ করার জন্য তৈরি হয়েছে ‘মিনি-ডোম’ ক্যামেরা, ‘গভীর সাগরের সেলফি স্টিক’, টিকটক-ধাঁচের নিমজ্জিত ডাইভিং ফুটেজের জন্য পা-সংযুক্ত স্কুটার পরা ক্যামেরা অপারেটর, আর গভীর সাগরের প্রাণীদের চিত্রিত করতে ব্যবহার হয়েছে লেজার।
অনুষ্ঠানে ধরা পড়া অন্যান্য বিস্ময়কর প্রাণী-আচরণের মধ্যে রয়েছে গ্রুপার মাছের অন্য প্রজাতির মাছের সঙ্গে যোগাযোগ, দুই লাখ কাঁকড়ার সারিবদ্ধ হয়ে খাবার খাওয়া, সামুদ্রিক অর্চিনের খোলসকে রোদ-টুপি হিসেবে ব্যবহার, এবং পেঙ্গুইনদের এমন ফুটেজ যা ‘প্ল্যানেট আর্থ টু’-র বিখ্যাত ‘ইগুয়ানা বনাম সাপ’ দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সিরিজে মহাসাগরের প্রতি হুমকি এবং তার সহনশীলতা—দুটোই উঠে এসেছে। পর্বগুলোতে দেখানো হয়েছে, জলবায়ু সংকটে অ্যানিমোন ক্লাউন ফিশদের বাসস্থলের সাগর কীভাবে মরে যাচ্ছে এবং নিজেদের ঘর বাঁচাতে তারা কী করছে; ‘ব্লু প্ল্যানেট টু’-তে উঠে আসা প্লাস্টিকের বিষয়টি এবারও আছে দূষণকারী পদার্থ ও ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ নিয়ে একটি গল্পে, বলেন হোয়াইট।
বোসিগার জানান, ১০০ বছর বয়সী অ্যাটেনবোরো “খুব গভীরভাবে সম্পৃক্ত” ছিলেন এবং চিত্রনাট্যেও পরিবর্তন এনেছেন। হোয়াইট বলেন, “সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, তিনি তাঁর কৌতূহল হারাননি... নতুন কোনো ফুটেজ দেখালে তিনি এখনো সেই ছোট্ট ছেলেটির মতোই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।”
বিবিসির ৫০ কোটি পাউন্ড ব্যয়-সাশ্রয় অভিযান বিবিসি স্টুডিওসের বিখ্যাত ন্যাচারাল হিস্ট্রি সুনামকে প্রভাবিত করবে কিনা জানতে চাইলে হোয়াইট সরাসরি মন্তব্য করেননি; তবে তিনি উল্লেখ করেন, আগের সিরিজের তুলনায় লোকেশনে স্থানীয় দল বেশি ব্যবহার করে ‘ব্লু প্ল্যানেট থ্রি’-তে সাশ্রয় করা হয়েছে। ধারাবাহিকটি শুরু হচ্ছে রোববার ১ নভেম্বর বিবিসি ওয়ান ও আইপ্লেয়ারে।




