তিনটি প্লাস্টিকের বোতল জমা দিলেই একটি গাছের চারা: পাকুন্দিয়ায় বিতরণ হলো ৭০০ চারা
প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিলেই মিলছে গাছের চারা। পরিবেশদূষণ রোধ করা এবং বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহিত করতে এমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন ‘প্রয়াস’। তিনটি প্লাস্টিকের বোতল কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে একটি করে গাছের চারা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে পাকুন্দিয়া সদর ঈদগাহ মাঠে ‘প্লাস্টিকের বিনিময়ে বৃক্ষ’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। নির্ধারিত দিনে স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িতে জমিয়ে রাখা প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে মাঠে হাজির হন।
নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য জমা দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা সংগ্রহ করেন বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা। কর্মসূচিতে প্রায় ৭০০টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। শিশু, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
আয়োজকেরা জানান, প্লাস্টিক ও পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা নয়, মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বৃক্ষরোপণের অভ্যাস গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসা ছয়টি প্লাস্টিকের বোতল জমা দিয়ে দুটি গাছের চারা পেয়েছে। সে বলে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ প্লাস্টিক বর্জ্য সম্পর্কে সচেতন হবে; পাশাপাশি গাছ লাগানোর আগ্রহও বাড়বে। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ফুল-ফল দেয় এবং পরিবেশ সুন্দর রাখে—এমন উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সে ‘প্রয়াস’কে ধন্যবাদ জানায়।
১২টি প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেন গৃহিণী আয়েশা। তিনি বলেন, ব্যবহারের পর অনেক সময় প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয়, এতে পরিবেশের ক্ষতি হয়। ফেসবুকে এই কর্মসূচির কথা জানতে পেরে তিনি বোতল নিয়ে এসেছেন। চারা পেয়ে ভালো লাগছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে যেমন প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ হচ্ছে, তেমনি বাড়িতে গাছ লাগানোও হবে।
সংগঠনটির আহ্বায়ক নূরুল জান্নাত মান্না বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহিত করতেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রায় ৭০০টি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। মানুষের ব্যাপক সাড়া তাঁদের ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি জানান।
পাকুন্দিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি এস এ এম মিনহাজ উদ্দিন বলেন, পরিবেশ রক্ষায় ‘প্রয়াস’-এর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সমালোচনায় কান না দিয়ে এই ধরনের ভালো কাজ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। এসব বর্জ্য নদী-সাগরে গিয়ে জলজ পরিবেশের ক্ষতি করছে। তাই যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলে সঠিকভাবে সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মত দেন।
উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সহজ শর্ত—বর্জ্য জমা দেওয়ার মতো ছোট একটি কাজের বিনিময়ে মিলছে একটি জীবন্ত গাছ, যার যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও থেকে যাচ্ছে গ্রহীতার হাতে। ফলে কর্মসূচির প্রভাব শুধু এক দিনের চারা বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রতিটি চারা বড় হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীদের পরিবেশভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে রাখছে।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের সাড়া দেখে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাকুন্দিয়ার এই ছোট উদ্যোগ এখন স্থানীয়দের কাছে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বৃক্ষরোপণ—দুই কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।



