চিনিযুক্ত পানীয় ছাড়াই সতেজ থাকা যায়: যেসব সহজ বিকল্পে কমবে ওজন ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
সকালের চা আর প্যাকেটজাত ফলের রস থেকে শুরু করে ফিজি ড্রিংকস, মিষ্টি কফি ও এনার্জি ড্রিংকস পর্যন্ত — চিনিযুক্ত পানীয় দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ অংশ হয়ে উঠেছে। এগুলো দ্রুত শক্তি জোগাতে পারলেও নিয়মিত পান করলে শরীরে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়।
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, দাঁতের ক্ষয় ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাই পানীয়ের অভ্যাসে ছোট পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল দিতে পারে।
সুখবর হলো, চিনি কমানোর অর্থ প্রিয় পানীয় পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়। কিছু সাধারণ অদলবদলের মাধ্যমে পানীয়কে সতেজ ও উপভোগ্য রেখেই অতিরিক্ত চিনি কমানো যায়।
ফিজি ড্রিংকসের বদলে স্পার্কলিং ওয়াটার একটি সহজ বিকল্প। সফট ড্রিংকসে প্রচুর অতিরিক্ত চিনি থাকলেও পুষ্টিগুণ খুব কম; বিএমসি পাবলিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় নিয়মিত সফট ড্রিংকস পানে টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কথা বলা হয়েছে। লেবু, লাইম বা কমলার রস মেশানো সাধারণ স্পার্কলিং ওয়াটার সেই ঝাপসা স্বাদের আনন্দ দিতে পারে চিনি ছাড়াই। বাড়তি স্বাদের জন্য পুদিনা পাতা বা শসার টুকরোও যোগ করা যায়, আর তাজা ফলসহ ঠান্ডা পানিও হতে পারে আরেকটি সহজ পানীয়।
প্যাকেটজাত ফলের রসের বদলে আস্ত ফল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্যাকেটের রসে অতিরিক্ত চিনি থাকতে পারে; এমনকি শতভাগ ফলের রসেও প্রাকৃতিক চিনি থাকে এবং আস্ত ফলের তুলনায় ফাইবার কম থাকে। কমলা, আপেল, পেয়ারা বা তরমুজের মতো আস্ত ফল ফাইবার জোগায়, হজমে সাহায্য করে ও পেট ভরা অনুভব করায়। রস পছন্দ হলে অল্প পরিমাণে চিনিবিহীন শতভাগ ফলের রস বেছে নেওয়া যায়, তবে প্রতিদিনের জন্য আস্ত ফলই সেরা।
চা ও কফির ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে চিনি কমানোই কৌশল। কয়েক চামচ চিনি, ফ্লেভারযুক্ত সিরাপ বা মিষ্টি ক্রিমার ব্যবহার করলে প্রতিদিনের এক কাপ চা-কফিও অতিরিক্ত চিনির বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। সাধারণত দুই চা-চামচ চিনি নিলে প্রথমে দেড়, তারপর এক চা-চামচে নামিয়ে আনা যায়। বাড়তি স্বাদের জন্য দারুচিনি, এলাচ বা আদা দিয়ে পরীক্ষা করা যায়; বোতলজাত মিষ্টি কফির বদলে সাধারণ কফি বা চা বেছে নেওয়াও ভালো।
মিষ্টি মিল্কশেকের বদলে ঘরে তৈরি সংস্করণ হতে পারে স্বাস্থ্যকর বিকল্প। আইসক্রিম, সিরাপ বা মিষ্টি পাউডার দিয়ে তৈরি মিল্কশেক ও ফ্লেভারযুক্ত দুধের পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি থাকে। এর বদলে দুধ বা চিনি ছাড়া দইয়ের সঙ্গে কলা বা স্ট্রবেরির মতো অল্প ফল ব্লেন্ড করে নেওয়া যায়; অতিরিক্ত পুষ্টির জন্য কয়েকটি বাদাম বা বীজও যোগ করা যায়। মধু ও গুড়কে স্বাস্থ্যকর মনে হলেও সেগুলোও পরিমিতভাবে ব্যবহার করা উচিত।
এনার্জি ড্রিংকস নিয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছে। এগুলোতে প্রচুর চিনি থাকতে পারে, অনেকগুলোতে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইনও থাকে। দৈনন্দিন পানীয় হিসেবে এগুলো অপরিহার্য নয়; অতিরিক্ত গ্রহণে ঘুমের ব্যাঘাত, বুক ধড়ফড় বা অস্থিরতা হতে পারে। নিয়মিত পানীয় হিসেবে সাধারণ পানিই যথেষ্ট, বিশেষ করে অল্প সময়ের ব্যায়ামে; দীর্ঘ ও তীব্র ব্যায়াম বা অতিরিক্ত ঘামের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোলাইট প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। ক্রমাগত ক্লান্তির কারণে এনার্জি ড্রিংকসের দিকে ঝুঁকলে ঘুম, খাদ্যাভ্যাস ও পানীয়ের বিষয়টি ভাবা উচিত এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
মিষ্টিযুক্ত প্যাকেটজাত পানীয় কেনার আগে পুষ্টির লেবেল দেখে নেওয়া জরুরি। মিষ্টি আইসড টি, ফ্লেভারযুক্ত পানি, স্পোর্টস ড্রিংকস ও রেডি-টু-ড্রিংক পানীয় অজান্তেই খাদ্যতালিকায় চিনি যোগ করে। প্রতি ১০০ মিলিলিটারে মোট চিনির পরিমাণ ও পরিবেশনভিত্তিক পরিমাণ তুলনা করা এবং উপাদানের তালিকায় অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ ও কনসেনট্রেট আছে কি না দেখা উচিত।
বেশি করে সাধারণ পানি, চিনিবিহীন চা বা অতিরিক্ত চিনি ছাড়া দুধ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিনি ছাড়া ঘোল আরেকটি উপকারী বিকল্প, বিশেষ করে গরমকালে।
সব পরিবর্তন একসঙ্গে করার দরকার নেই। প্রতিদিন একটি করে চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে পানি বা চিনিবিহীন বিকল্প বেছে নিয়ে শুরু করা যায়। পানির বোতল সঙ্গে রাখা, ঠান্ডা পানি হাতের কাছে রাখা এবং ধীরে ধীরে পানীয়ের মিষ্টতা কমিয়ে আনা — এই ছোট ছোট পরিবর্তনই অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমাতে ও দাঁতসহ সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
লক্ষ্য সব মিষ্টি পানীয় বাদ দেওয়া নয়, বরং কম চিনিযুক্ত পানীয় বেশি করে বেছে নেওয়া — এই সহজ নীতিই এই স্বাস্থ্য পরামর্শের মূল কথা।



