গাঁজানো খাবার সবার জন্য নয়: কাদের ক্ষেত্রে দই-আচারেও সতর্কতা জরুরি, যা বলছে গবেষণা
ঘরে তৈরি দই থেকে শুরু করে দোসা আর আচার—গাঁজানো বা ফার্মান্টেড খাবার আমাদের খাদ্যাভ্যাসের নিয়মিত অংশ। এসব খাবার উপকারী অণুজীব সরবরাহ করে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, তবে তা নির্ভর করে খাবারটি কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে তার ওপর। আর এই খাবারগুলো সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত না-ও হতে পারে।
বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য, সঠিকভাবে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করা হলে ফার্মান্টেড খাবার নিরাপদ। কিন্তু যাদের নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অসুস্থতা, খাবারে অসহিষ্ণুতা বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের এই খাবার গ্রহণের ধরন ও পরিমাণ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হতে পারে। এসব ব্যতিক্রম সম্পর্কে জানা থাকলে আরও ভালোভাবে খাবার বেছে নেওয়া সহজ হয়।
কিছু ফার্মান্টেড খাবারে হিস্টামিন ও অন্যান্য বায়োজেনিক অ্যামাইন থাকে, যা এগুলোর প্রতি সংবেদনশীল ব্যক্তিদের মধ্যে উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। এর পরিমাণ খাবার, উপাদান, গাঁজন প্রক্রিয়া ও সংরক্ষণের অবস্থার ওপর নির্ভর করে বদলায়।
হিস্টামিন অসহিষ্ণুতা আছে এমন ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কিছু খাবার খাওয়ার পর মাথাব্যথা, মুখ লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি, নাক দিয়ে পানি পড়া, হজমের অস্বস্তি বা বুক ধড়ফড় করার মতো উপসর্গ অনুভব করতে পারেন।
নিউট্রিয়েন্টস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, যেসব ফার্মান্টেড খাবারে উচ্চ পরিমাণে হিস্টামিন থাকতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরোনো চিজ, কিছু গাঁজানো সবজি, গাঁজানো সয়া পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়াজাত বা গাঁজানো মাংস।
তবে হিস্টামিনের প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিভেদে ব্যাপকভাবে বদলায় এবং এসব উপসর্গ থাকলেই প্রত্যেকের হিস্টামিন অসহিষ্ণুতা থাকে না। যাদের মধ্যে এমন কোনো সংযোগের সন্দেহ হয়, তাদের ডায়েটিশিয়ান বা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
খাবারের অন্য উপাদানও উপসর্গের কারণ হতে পারে। প্রস্তুতির সময় যোগ করা মসলা, ভিনেগার, প্রিজারভেটিভ ও অন্যান্য উপাদানও সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই গাঁজন প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিক্রিয়া আর অন্য কোনো উপাদানের প্রতি অ্যালার্জি বা সংবেদনশীলতার মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর বারবার উপসর্গ দেখা দিলে কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন, তা ঠিক করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দই ও ইয়োগার্ট আমাদের পরিবারগুলোতে প্রচলিত গাঁজানো দুগ্ধজাত খাবার। জার্নাল অব ডেয়ারি রিসার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গাঁজন প্রক্রিয়ার ফলে দুধের ল্যাকটোজের পরিমাণ কিছুটা কমে যায় এবং ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা আছে এমন অনেক মানুষ সাধারণ দুধের চেয়ে দই ভালোভাবে সহ্য করতে পারেন।
তবে এই সহনশীলতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। দই বা অন্যান্য গাঁজানো দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পরেও কারও কারও পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটে ব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে। যারা এসব উপসর্গ অনুভব করেন, তারা অল্প পরিমাণে বা ল্যাকটোজমুক্ত বিকল্প চেষ্টা করতে পারেন, যদি সেগুলো তাদের জন্য উপযুক্ত হয়। তাদের সব ফার্মান্টেড খাবার এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই, কারণ গাঁজানো চালের ব্যাটার ও কিছু গাঁজানো সবজির মতো বিকল্পগুলোতে দুগ্ধজাত উপাদান থাকে না।
যারা কেমোথেরাপি নিচ্ছেন, যাদের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং কিছু ব্যক্তি যারা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দমনকারী ওষুধ গ্রহণ করেন, তারা খাদ্যবাহিত সংক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারেন। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রস্তুত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ফার্মান্টেড খাবার এদের কয়েকজনের জন্য উপযুক্ত হতে পারে, কিন্তু অপাস্তুরিত পণ্য ও বাড়িতে তৈরি খাবারে বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকি থাকে।
যাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল, তাদের চিকিৎসকের কাছে জিজ্ঞাসা করা উচিত কোন ফার্মান্টেড খাবারগুলো তাদের জন্য নিরাপদ। তাদের এমন পণ্য এড়িয়ে চলা উচিত, যেগুলোতে দৃশ্যত ছত্রাক পড়েছে, নষ্ট হয়ে গেছে বা ভুলভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
লবণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফার্মান্টেড খাবার যেমন আচার ও কিছু গাঁজানো সবজিতে যথেষ্ট পরিমাণে লবণ থাকতে পারে। বেশি পরিমাণে খেলে সোডিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট ফেইলিওর বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে লবণ সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে। শুধু গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণেই কোনো খাবারে সোডিয়াম বেশি হবে, এমনটা নয়; এর পরিমাণ নির্ভর করে রান্নার পদ্ধতির ওপর। বাড়িতে তৈরি আচার ও গাঁজানো সবজি কখনো কখনো কম লবণ দিয়ে প্রস্তুত করা যেতে পারে, কিন্তু গাঁজনে লবণ কমানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি, কারণ এটি খাদ্য সুরক্ষাকে প্রভাবিত করতে পারে।
নির্দিষ্ট কিছু হজমজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও চিত্রটা একরকম নয়। ফার্মান্টেড খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করার উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়, কিন্তু এটি সবার জন্য একইভাবে উপকারী নয়। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমে (আইবিএস) আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ফার্মান্টেড খাবার পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলতে পারে। কিছু পণ্যে গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সংবেদনশীল ব্যক্তিদের মধ্যে উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে মূল বার্তাটি হলো—ফার্মান্টেড খাবারকে একবাক্যে সবার জন্য উপকারী বা সবার জন্য ক্ষতিকর বলা যায় না। নিজের শারীরিক অবস্থা, অসহিষ্ণুতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ ও ধরন বেছে নেওয়া, প্রয়োজনে কম সোডিয়ামযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া এবং ডাক্তারের খাদ্যতালিকা-সংক্রান্ত পরামর্শ মেনে চলাই নিরাপদ পথ।



