পুড়ে যাওয়া লিমোজ সিটি হল এখন বিভক্ত ফ্রান্সের প্রতীক: বিক্ষোভের আগুনে ভস্ম ঐতিহাসিক ভবন
ফ্রান্সের লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক সিটি হলের আগুনে পোড়া ধ্বংসাবশেষ এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ আর বিভক্তির সবচেয়ে আলোচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহের দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় ভবনটিতে আগুন দেওয়া হয়; আগুনে ঊনবিংশ শতাব্দীর ভবনটির কাঠের ঘণ্টাঘরটি ধসে পড়ে, আর সেই দৃশ্য সারা ফ্রান্সে ধাক্কা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়।
মাত্র ছয় মাস আগে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়া গিয়োম গেরাঁর জন্য এই সপ্তাহটি ছিল অভাবনীয় ভারী। পোড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, এটি শুধু লিমোজের জন্য নয়, পুরো ফ্রান্সের জন্যই একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রথম দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন বলেও জানা গেছে, আর জনগণের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াকে তিনি বৈধ ও সম্পূর্ণ বোধগম্য বলে মন্তব্য করেছেন।
আগুনের ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে — একজনের বয়স ৬৬ বছর, অন্যজনের ৩৪। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে 'চরম-বাম নেটওয়ার্কের' যোগসূত্র রয়েছে। মেয়র গেরাঁ ক্ষতির জন্য ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থীদের দায়ী করেছেন; তাঁর দাবি, দাঙ্গাকারীদের সমর্থনেই এই ঘটনা ঘটেছে।
লিমোজের এই রক্ষণশীল মেয়রের আরেকটি মন্তব্য আলোচনায় এসেছে — তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে তিনি সমর্থনের বার্তা পেয়েছেন, কিন্তু নিজের দেশের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছ থেকে পাননি। তাঁর কথায়, এখানে যা ঘটেছে, তা আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে; দেশের অবস্থা মোটেই ভালো নয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সজুড়ে লাখ লাখ মানুষ, যাদের বড় অংশই তরুণ, রাজপথে বিক্ষোভ করছেন; আন্দোলনটি দিন দিন বড় ও বিস্তৃত হচ্ছে। উচ্চবিদ্যালয়গুলোর বেহাল অবস্থার প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও কঠিন বাস্তবতা নিয়ে সাধারণ হতাশা ও ক্ষোভের রূপ নিয়েছে।
এর পেছনে রয়েছে ইউরোপের অন্যতম বড় রাজস্ব ঘাটতির চাপ। ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সব পক্ষের প্রার্থীরাই সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; মাঝখানে কেন্দ্রপন্থী সরকার সমাধান, জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর সময় — তিন দিক থেকেই সংকটে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু শুক্রবার সন্ধ্যায় লিমোজ সফর করেছেন।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আবার দাঙ্গা এড়াতে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে এবং বাড়তি পুলিশ মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লিমোজে রাতের কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে, আর শহরের কেন্দ্রে ১০ জনের বেশি জমায়েতের ওপর সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
তবে সিটি হল ধ্বংসের ঘটনায় লিমোজের সবাই একমত নন। ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আলেকজান্ডারের প্রশ্ন — অবশ্যই এটি দুঃখজনক, এটি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক; কিন্তু কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, একটি সিটি হল, নাকি দারিদ্র্যে বসবাসকারী মানুষ? লিমোজে প্রায় পাঁচ লাখ ইউরো ক্ষয়ক্ষতির খবর এলেও তিনি মনে করেন, কিছু বিষয় বিপর্যয়কর হলেও সব বিক্ষোভকারীকে এক কাতারে ফেলা যায় না।
১৯ বছর বয়সী মেডিকেল শিক্ষার্থী জেডের মতও প্রায় একই — সিটি হল পোড়ানো দুঃখজনক, কিন্তু বিক্ষোভের সবচেয়ে দুঃখজনক অংশ এটি নয়। মাসে মাত্র ৩০০ ইউরোতে তাকে চলতে হয় বলে তিনি জানান; তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তারা সম্মান পাচ্ছেন না বলেও তার অভিযোগ।
অন্যদিকে শহরের বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে এই সপ্তাহটি ছিল বিশৃঙ্খলায় ভরা। ৬৩ বছর বয়সী মাছবিক্রেতা জঁ রজে ফোশের পরিবার এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এখানে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, এই ঘটনা তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে; এই সিটি হলেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল, তাই এর প্রভাব তাঁর কাছে অবর্ণনীয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ তিনি কিছুটা বুঝলেও ভাঙচুর আর মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে তাঁর মত।
৫৯ বছর বয়সী পাসকাল ভ্যুলস্তেকের কথায়ও ক্লান্তির সুর — জীবন ব্যয়বহুল, তা ঠিক; কিন্তু জীবন সব সময় শান্ত নদীর মতো নয়, দাঁতে দাঁত চেপে কাজ করেই চলতে হয়। সপ্তাহে ১০০ ঘণ্টা কাজ করা এই নারী বুঝতে পারছেন না, এত মানুষ এত সহজে কেন রাজপথে নেমে এসেছে।
লিমোজের রাজপথের আন্দোলনে থাকার ইতিহাস নতুন নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে, সিটি হলটি নির্মাণের সময়েই, পোরসেলিনসহ নানা শিল্পের বিকাশে শহরটি ফরাসি শ্রমিক আন্দোলনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ২০২৬ সালে শহরটি আবার রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দুতে; তবে ব্যাপক আশা, ইতিহাসের এই মূল্যবান নিদর্শন হারানোর ঘটনা বিক্ষোভকে ধ্বংসের পথ থেকে আলোচনার পথে ফেরাবে।
কিন্তু ফ্রান্সের রাজনৈতিক মেরুকরণ অব্যাহত থাকায় এবং আরও বিক্ষোভের পরিকল্পনা থাকায় সেই পরিণতি মোটেই নিশ্চিত নয়। পোড়া সিটি হলের ধ্বংসস্তূপ এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে — দারিদ্র্য ও ব্যয়ের চাপে ক্ষুব্ধ তরুণদের আন্দোলন কোন পথে যাবে, আর প্রতীকী ভবনের এই ক্ষতি ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিতর্কের সুর বদলাতে পারবে কি না।






