ব্রিটেনে ফিরছে পরিজের যুগ: ফাইবারের খোঁজে শতাব্দীপ্রাচীন সকালের খাবার এখন রেস্তোরাঁর তারকা
ব্রিটেনে এই সপ্তাহান্তে ঘড়ির কাঁটা পেছানো হচ্ছে, তবে শীত যে আসছে তার সবচেয়ে বড় লক্ষণ অনেকের কাছে সকালের টেবিলে ধোঁয়া ওঠা এক বাটি পরিজ। ওটস, পানি আর এক চিমটি লবণ বা চিনি দিয়ে তৈরি এই খাবারটি শত শত বছর ধরে ব্রিটিশ সকালের নাশতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে একসময়ের সাদামাটা এই খাবারটি এখন নতুন রূপে ফিরে এসেছে। সাধারণ থেকে জমকালো হয়ে ওঠা পরিজ এখন রেস্তোরাঁর মেনুতে জায়গা করে নিয়েছে, আর এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে ফাইবারকেন্দ্রিক একটি স্বাস্থ্য আন্দোলন এবং পুরোনো দিনের স্মৃতির টান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেসিপি নির্মাতারা পরীক্ষা চালাচ্ছেন নানা ধরনের নতুন সংস্করণ নিয়ে — কোথাও মিসো পরিজ, কোথাও টক চেরি আর পেস্তা মাখনের টপিং। মধ্য লন্ডনের পরিজবিষয়ক রেস্তোরাঁ ‘২৬ গ্রেইনস’-এ এই মাসের আয়োজনে রয়েছে পাঁচ ধরনের শস্যের পরিজ, যার ওপরে ডুমুর ও লাল আঙুরের জ্যাম এবং এক চামচ হুইপড ক্রিম।
পশ্চিম লন্ডনের ‘ওটিস’ রেস্তোরাঁয় টপিংয়ের তালিকা আরও বিস্তৃত — ক্যারামেলাইজড কলা ও তাহিনি থেকে শুরু করে মাশরুম ও পেস্তো পর্যন্ত। অর্থাৎ পরিজ এখন আর শুধু মিষ্টি খাবার নয়, নোনতা স্বাদেও পরিবেশিত হচ্ছে।
২৬ গ্রেইনসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স হেলি-হাচিনসন পরিজকে বর্ণনা করেছেন ‘এক বাটি আরাম’ হিসেবে। তাঁর মতে, এই খাবারের আকর্ষণের একটি অংশ হলো ব্যস্ত পৃথিবীতে এটি মানুষকে একটু থামার মুহূর্ত দেয় — আর প্রায় সবাই জানে এটি কীভাবে বানাতে হয়।
প্রবণতাটি ঘরের কেনাকাটাতেও প্রভাব ফেলেছে। অনলাইন গ্রোসারি প্রতিষ্ঠান ওকাডোতে জৈব জাম্বো ওটসের খোঁজ বেড়েছে বছরে ৯৮ শতাংশ, আর ‘হোয়াইটস’ জাম্বো ওটসের বিক্রি বেড়েছে ৫৬ শতাংশ।
দক্ষিণ লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রথম নিবেদিত সিরিয়াল বেকারি ‘হাস্ক অ্যান্ড হানি’র প্রতিষ্ঠাতা হেডিয়ে রোডস মনে করেন, পরিজকে নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগই এই প্রবণতার বড় চালিকাশক্তি। ২০১৫ সালে গ্রানোলা দিয়ে শুরু করা তাঁর ব্র্যান্ড এখন আলাদা পরিজ মিশ্রণও বিক্রি করে; সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় দারুচিনির ছাল ও ক্র্যানবেরি এবং মসলাদার আপেলের সংস্করণ।
রোডস বলেন, ‘পরিজ অনেক সুন্দর জিনিসের বাহক হতে পারে। বড় এক হাঁড়ি বানালে পরিবারের প্রত্যেকে নিজের স্টাইলে খেতে পারে — কেউ শুধু মধু দিয়ে, কেউ অভিনব সব টপিং দিয়ে।’
খাদ্য উদ্ভাবন স্টুডিও হ্যারিস অ্যান্ড হেইসের সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স হেইস পরিজকে তুলনা করেছেন সালাদ ও স্মুদির সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন একটি ‘ক্যানভাস’, যেখানে স্বাদ ও পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী টপিং যোগ করা যায় — বাদামের মাখন থেকে শুরু করে সাইলিয়াম হাস্কের মতো কার্যকরী উপাদান পর্যন্ত।
প্রোটিনের প্রতি আগ্রহ কম না হলেও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ‘ফাইবারম্যাক্সিং’ প্রবণতা এখন মানুষকে ফাইবার খাওয়া বাড়াতে উৎসাহিত করছে। ব্রিটেনের এনএইচএস প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়, কিন্তু ব্রিটিশ ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে গড়ে খাওয়া হয় মাত্র ১৮ গ্রাম। ওটস হলো দ্রবণীয় ফাইবারের উৎস, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি এবং কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করতে পারে। ফলে প্রোটিনসমৃদ্ধ ডিমের বদলে অনেকে আবার পরিজের বাটির দিকে ফিরছেন।
আইল অব স্কাইয়ের ‘ক্যাফে কুইল’-এর মেনুতে রয়েছে পিনহেড ওটসের ‘উই পরিজ’, যা রাতভর ওট মিল্কে ভিজিয়ে রাখা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ও শেফ ক্লেয়ার কগহিল মৌসুমি টপিং দিয়ে তা শেষ করেন — এই মুহূর্তে রয়েছে হ্যাজেলনাট প্রালাইন ব্রিটল ও সিদ্ধ নাশপাতি।
কগহিল সম্প্রতি ৮৬ বাটি পরিজের স্বাদ নিয়েছেন স্কটিশ হাইল্যান্ডসে প্রতি বছর আয়োজিত বিশ্ব পরিজ তৈরির চ্যাম্পিয়নশিপের বিচারক প্যানেলের সদস্য হিসেবে। তাঁর মতে, ‘পরিজ বিশুদ্ধতাবাদীরা’ নরম রোলড ওটসের বদলে মোটা পিনহেড ওটস — যা স্টিল-কাট ওটস নামেও পরিচিত — পছন্দ করেন, কারণ পিনহেডই ছিল আসল ওটস এবং এটি স্কটিশ ঐতিহ্য উদ্যাপনের একটি উপায়।
ভালো পরিজের রহস্য নিয়ে কগহিল বলেন, নাড়াচাড়াই মূল কথা — হাঁড়ি ধীরে ধীরে গরম করে ‘স্পার্টল’ অর্থাৎ নাড়ানি ক্রমাগত ঘোরাতে থাকলে রেশমি মসৃণ পরিজ পাওয়া যায়। আর হেলি-হাচিনসন নিজে খান তুলনামূলক নরম পরিজ — মায়ের হাতে বানানো শৈশবের স্বাদের মতো করে।
এখন পরিজ সকালের টেবিল পেরিয়ে দিনের অন্য সময়েও জায়গা করে নিচ্ছে। হেলি-হাচিনসনের ভাষায়, ব্যস্ত মানুষ সহজ একটি খাবারের প্রতি আগ্রহী, আর বিকেল ৩টার পর মেনুতে পরিজ না থাকলে গ্রাহকরা বিরক্ত হন। হেইসের ধারণা, সামনে আরও নোনতা সংস্করণ দেখা যাবে — চীনা কনজি ও হলুদ মুগডালের ভারতীয় খিচরি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এই পরিজ-উন্মাদনার একমাত্র অসুবিধা হিসেবে সবাই একমত: শেষে হাঁড়িটি ধুতে হওয়া।






