…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › কৃষি › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
কৃষি

গাছে পচছে পেঁপে, মাঠে লাউয়ের দাম এক টাকায় চারটি: ফলন বাড়লেও বিপাকে কৃষক, রাজধানীতে দাম চড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক

লাউয়ের বাগানে ফলন হয়েছে প্রচুর, পেঁপেগাছেও ঝুলছে পাকা ফল। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ক্রেতার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় এসব সবজির দাম নেমেছে তলানিতে। কোথাও চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র এক টাকায়, আবার কোথাও এক কেজি পেঁপের দাম দুই থেকে তিন টাকা।

এমন পরিস্থিতিতে ফসল তোলা, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকসান কমাতে কোনো কৃষক লাউয়ের গাছ কেটে ফেলছেন, কেউবা পেঁপে না তুলেই গাছে নষ্ট হতে দিচ্ছেন।

অথচ রাজধানীর খুচরা বাজারে একটি লাউয়ের দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। পেঁপিও বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৩০ টাকায়। উৎপাদনস্থল থেকে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত দামের এই বিশাল ব্যবধান কৃষকের দুরবস্থা এবং কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে।

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় এবার লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। কোনো এলাকায় চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও প্রতিটি লাউয়ের দাম দুই থেকে পাঁচ টাকা। অথচ স্থানীয় খুচরা বাজারে একটি লাউ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।

উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষে বিনিয়োগ করেছিলেন ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন পর্যন্ত উৎপাদিত লাউ বিক্রি করে তাঁর আয় হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকা। তাঁর ভাষ্য, বিক্রির টাকা দিয়ে শ্রমিকের মজুরিও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না; দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনার সমপরিমাণ অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তিনি বাগান কেটে ফেলেছেন, কিছু লাউ গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রশ্ন, এত পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয়ের পরও কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন কীভাবে?

একই উপজেলার ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার কৃষক আনসারুল ইসলামও লোকসানের চাপে লাউ বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। তাঁর মতে, সার ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে; একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয়। অথচ লাউ বিক্রি করে মিলছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পর্যন্ত। এই দামে পরিচর্যা চালালে লোকসান আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাঁর।

লাউয়ের মতো পেঁপে চাষিরাও পড়েছেন বিপাকে। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় এবার প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অনুকূল আবহাওয়া, উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার এবং চাষের জমি বাড়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাজারে বিপুল পরিমাণ পেঁপে আসায় দাম কমে গেছে ব্যাপকভাবে।

সিংগাইরের বিভিন্ন এলাকায় জমি থেকেই প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকায়। এই দামে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, জমির ভাড়া ও শ্রমিকের খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক গাছ থেকে পেঁপে সংগ্রহ করছেন না; কোথাও পাকা ফল গাছেই নষ্ট হচ্ছে, আবার কোথাও পেঁপের বাগান সরিয়ে অন্য ফসল চাষের প্রস্তুতি চলছে।

উপজেলার গোপালনগর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন দুই বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু বিক্রির সময় ক্রেতারা কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকার বেশি দিতে চাইছেন না। তাঁর মতে, এই দামে পেঁপে বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরি ও ভ্যানভাড়াই মেটানো কঠিন। একই উপজেলার কৃষক তাজুল সিকদার লোকসান সামাল দিতে দুই বিঘা জমির পেঁপেগাছ কেটে ফেলেছেন; এখন বিকল্প ফসল চাষের কথা ভাবছেন তিনি।

পেঁপের দাম কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পাইকার ও আগাম অর্থ বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের ওপরও। ঢাকার পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহ ধরে কাঁচা পেঁপে কেজিপ্রতি চার থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে খুচরা বাজারে পেঁপের দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। আগের বছরের উচ্চমূল্যের অভিজ্ঞতায় এবার অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী উৎপাদন এবং আগাম বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

কারওয়ান বাজারের পেঁপে ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান গত বছর ভালো দাম পাওয়ার অভিজ্ঞতায় এবার পাঁচ জেলার কৃষকদের অগ্রিম তিন কোটি টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু দাম পড়ে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে পেঁপে কেজিপ্রতি ছয় থেকে সাত টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি, পরে দাম আরও কমে চার টাকায় নেমে আসে। অথচ চুয়াডাঙ্গা ও যশোর থেকে ঢাকায় পেঁপে পরিবহন করতেই কেজিপ্রতি চার টাকার বেশি ব্যয় হয়। অগ্রিম দেওয়া তিন কোটি টাকার মধ্যে ৫০ লাখ টাকাও ফেরত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি; ব্যাংকঋণ ও সুদের অর্থ পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই ব্যবসায়ী।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে তিন টন পেঁপে নিয়ে কারওয়ান বাজারে এসেছিলেন অজি উল্যাহ। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, জমির ভাড়া, বীজ ও সারসহ উৎপাদন খরচ পড়ে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা; পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ যোগ হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বাজারে পেঁপে বিক্রি করতে হয়েছে কেজিপ্রতি ছয় থেকে আট টাকায়। কারওয়ান বাজারে দুই দশক ধরে সবজি বিক্রি করা আবু বকরের অভিজ্ঞতায়, পেঁপের দাম এত নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা বিরল।

আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় কিছু পণ্যের পাইকারি দামেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বগুড়ার মহাস্থান পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোলের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫ থেকে ৩০ টাকা, করলা ৫৫ থেকে ৪৫ টাকা, ফুলকপি ৭০-৮০ থেকে ৬০ টাকা এবং মুলার দাম ৩৫ থেকে ২২ টাকা হয়েছে। তবে পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা বাজারে একই হারে কমেনি; বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে পটোল কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় ক্রেতাদের আগ্রহের পরিবর্তন ঘটেছে। পাশাপাশি লাউ ও পেঁপে সারা বছর পাওয়া যায় বলে এসব পণ্যের চাহিদায় প্রভাব পড়ছে। তিনি জানান, লাউ ও পেঁপের আবাদ এবং উৎপাদন দুটিই বেড়েছে; অনেক জেলায় উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে ফলন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সরবরাহও বেড়েছে, আর সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কম থাকায় দাম কমে গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, লাউ ও পেঁপের দরপতন দেশের কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করছে। তাঁর মতে, উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আয় বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই; দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে বাজারে একসঙ্গে সরবরাহ বেড়ে গেলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের সংকট বারবার দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তিনি কৃষিমূল্য কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন; পাশাপাশি ভারতের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের উদাহরণ, ফসলবিমা কর্মসূচি এবং সরকারি পর্যায়ে কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও মজুতের ব্যবস্থার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, উৎপাদন পরিকল্পনা, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ একসঙ্গে না নিলে ভালো ফলনও কৃষকের জন্য আর্থিক বিপর্যায়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

কৃষি বিভাগের আরও খবর

কৃষি

ঢাকায় ব্রয়লার ১৯০, খামারির হাতে মাত্র ১৩৪: ডিমেও ডজনে ৫৩ টাকার ফারাক, লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়, অথচ প্রান্তিক খামারি সেই মুরগি বিক্রি করছেন মাত্র ১৩৪ টাকা কেজি দরে। দুই পর্যায়ের দাম…

কৃষি

ভোরের জলাশয়ে পলো হাতে শত শত মানুষ: মানিকগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী মাছ শিকারের উৎসব, দেশি মাছ রক্ষার তাগিদ

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পলো হাতে জলাশয়ে নেমে পড়েন নানা বয়সী মানুষ। কারও পলোতে ধরা পড়ে বোয়াল, শোল কিংবা রুই, কেউ ফেরেন খালি হাতে। গতকাল শুক্রব…

কৃষি

আগাম শীতের সবজি বাজারে এলেও দাম চড়া, ঊর্ধ্বমুখী মাছ-ডিম ও আদা-রসুনের দর

রাজধানীর বাজারে আসতে শুরু করেছে আগাম শীতকালীন সবজি। পাড়া-মহল্লার কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সড়কের পাশের ভ্যানেও মিলছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিমসহ নানা ধরন…

কৃষি

সিরাজগঞ্জে ফুলজোড় নদী থেকে অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন, ফসলি জমি হারানোর শঙ্কায় কৃষকেরা

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী ফুলজোড় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরু…