ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ বাদী হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে: চাঁদাবাজি রুখতে আসছে নতুন আইন, জানালেন আইজিপি
দেশ থেকে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই, কেবল ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
শনিবার খুলনা পুলিশ লাইন্সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ সভায় আইজিপি এই তথ্য জানান। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই ঘোষণাকে পুলিশ সদর দপ্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইজিপি বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সমাজে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো আধিপত্য বজায় রেখে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের ভীতি ও ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে কিংবা আদালতে সাক্ষ্য দিতে সাহস পান না।
এই বাস্তবতায় অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতেই নতুন আইনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। আইনটি কার্যকর হলে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ নিতে পারবে এবং কোনো ঘটনার সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল প্রমাণ মিললেই অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় মামলা বা ব্যবস্থা গ্রহণের সূচনা আর ভুক্তভোগীর সাহসের ওপর নির্ভর করবে না। ডিজিটাল প্রমাণ হাতে এলেই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।
দায়িত্ব পালনে পুলিশের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আইজিপি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ বল প্রয়োগ করলে বলা হয় 'পুলিশ ফ্যাসিস্ট', আর বল প্রয়োগ না করলে বলা হয় 'পুলিশ দুর্বল'। এর কোনো অপবাদই বাহিনীর জন্য কাম্য নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, সবার সমন্বয়ে একটি পেশাদার ও কার্যকর পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার কাজ চলছে, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
বিগত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে পুলিশপ্রধান দাবি করেন, বিগত ১৭ বছরে দেশে মাদককে অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। তবে বর্তমান প্রশাসন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে।
কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান আইজিপি। নতুন চাঁদাবাজি-বিরোধী আইনের ঘোষণা সেই নীতিরই ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসেবে এসেছে।
কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে মাঠপর্যায়ে অর্থবহ করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, অতীতে এই ব্যবস্থা মূলত 'বুক প্র্যাকটিস' হিসেবে কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এবার স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে আইনি কাঠামোর ভেতরেই পুলিশের সহযোগী শাখা হিসেবে একে রূপ দেওয়া হচ্ছে, যাতে নাগরিক সেবার পরিধি আরও গতিশীল হয়।
মতবিনিময় সভায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান এবং খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিমসহ জেলা ও মহানগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এখন সবার নজর প্রস্তাবিত আইনের খসড়া ও তা পাসের প্রক্রিয়ার দিকে। আইনটি কার্যকর হলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধরনই বদলে যাবে—ভুক্তভোগীকে সামনে না এসেও অপরাধীর বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।





