যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার সর্বকালের সর্বনিম্নে, তবে বাড়ছে ত্রিশোর্ধ্ব নারীদের মাতৃত্ব
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নারীদের সাধারণ প্রজনন হার আরও ১ শতাংশ কমে নতুন রেকর্ড নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। দুই দশক ধরে চলা সন্তান কম নেওয়ার প্রবণতাই এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে পতনটা আরও বড় হতে পারত, যদি ত্রিশোর্ধ্ব নারীরা আগের চেয়ে বেশি সন্তান না নিতেন। সিডিসির তথ্যে দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সন্তান নেওয়ার হার ছোট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ হারে বেড়েছে।
অন্যদিকে বিশের কোঠায় থাকা নারীদের মধ্যে মা হওয়ার আগ্রহ দ্রুত কমছে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের জন্মহার এক বছরেই ৬ শতাংশ কমেছে। সিডিসির ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিসটিকসের জনসংখ্যাবিদ ও প্রতিবেদনটির সহ-লেখক ব্র্যাডি হ্যামিলটন বলেছেন, এই ৬ শতাংশ পতন ‘উল্লেখযোগ্য’। কিশোরী বয়সের শেষভাগের মেয়েদের ক্ষেত্রেও জন্মহার ৭ শতাংশ কমেছে।
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আটলান্টার গত মাসে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোরী ও বিশের কোঠায় থাকা জেনারেশন জেড নারীরা আগের প্রজন্মের নারীদের তুলনায় ‘নাটকীয়ভাবে কম’ সন্তান চান।
গবেষণায় সন্তান নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা কমার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে—নারীদের শ্রমবাজারে বর্ধিত সুযোগ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বাড়ন্ত আর্থিক ব্যয়, বদলে যাওয়া অগ্রাধিকার এবং মাতৃমৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ।
ফিলাডেলফিয়ার টেম্পল হেলথের লেবার ও প্রসব বিভাগের চিকিৎসা পরিচালক ডা. তানিস ব্রাঞ্চের ভাষ্য, তাঁর তরুণ রোগীদের অনেকেই এখন ভিন্ন জীবনছক অনুসরণ করছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁরা এখন শুধু সন্তানের জন্য কী আনতে পারবেন, তা নয়, নিজেদের জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো, সেদিকেও মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন।’
ব্রাঞ্চ নিজেও এই প্রবণতার অংশ। ক্যারিয়ার ও স্থিতিশীল জীবন গড়ে তারপর মা হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে চতুর্থ সন্তানের প্রত্যাশায় থাকা ব্রাঞ্চ বলেন, ‘আমার শেষ প্রসবের সময় বয়স হবে ৪৩; আমি এই প্রজননযাত্রা শুরু করেছিলাম ৩৭ বছর বয়সে। আমি ইতিবাচক দিকটাই দেখি—আমাদের হাতে পছন্দের সুযোগ রয়েছে।’
ভারমন্টের বাসিন্দা সারাহ হ্যারিসের গল্পটাও একই রকম। ৩৭ বছর বয়সে তিনি কন্যা ব্রিজেটের মা হয়েছেন গত বছর। মাতৃত্বকে তিনি আনন্দ ও ক্লান্তির সমান মিশেল বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘ত্রিশের মাঝামাঝি বয়সে সন্তান নিলে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় যা পান, শক্তির দিক থেকে তা-ই হারান।’
ব্রিজেট জন্মের চার মাস পর চাকরি হারান হ্যারিস। সন্তানসহ ক্যারিয়ার ও জীবন কেমন হবে, তা তিনি এখনো ভেবে উঠছেন। সন্তান লালন-পালনের উচ্চ ব্যয়ই তাঁকে এক সন্তানেই সীমিত থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘অন্য যুগে, অন্য জীবনে কিংবা অন্য পরিস্থিতিতে হলে হয়তো আমি আরও সন্তান নিতাম। আমরা এক কঠিন সামাজিক মুহূর্তে আছি, আর সেটা মানুষের প্রজনন-সিদ্ধান্তকে অবশ্যই প্রভাবিত করছে।’
এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সংখ্যা কমছে। মার্কিন জনশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে—২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তা ১০ লাখেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, সাশ্রয়ী আবাসন, শিশুযত্ন ও স্বাস্থ্যবিমাসহ যথাযথ সহায়তা পেলে নারীরা আরও সন্তান নিতে চাইতেন। পিতামাতার পছন্দ নিয়ে লেখা নতুন বই ‘ইনকনসিভেবল’-এর লেখক আনা লুই সুসম্যান বলেন, ‘অনেক মানুষ এখনো পরিবার চায়, কিন্তু মনে করে তারা তা গড়তে সক্ষম নয়—এটাই উদ্বেগের বিষয়। তরুণেরা বলে, আমি নিজেরই খেয়াল রাখতে পারছি না, অন্যের খেয়াল রাখব কীভাবে—কল্পনাও করতে পারি না।’
সুসম্যান নিজেও দেরিতে মা হওয়ার প্রবণতার অংশ। সাশ্রয় ও ক্যারিয়ার নিয়ে নিজের উদ্বেগের কারণে তিনি ডিম্বাণু হিমায়িত করে রেখেছিলেন এবং চল্লিশের শুরুতে সন্তান নেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে, বিশ বা ত্রিশের কোঠায় থাকার তুলনায় পেশাগতভাবে আমি এখন এগিয়ে আছি।’
নারীদের জীবন বদলাতে থাকা ও জন্মহার কমতে থাকায় বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও। দেশটির মানুষের গড় বয়স দ্রুত বাড়ছে—২০২৫ সালে তা পৌঁছেছে ৩৯.৪ বছরে। ভারমন্টসহ আরও অনেক রাজ্যে এখন প্রকৃত জনসংখ্যা হ্রাস দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জনশুমারি ব্যুরো। হ্যারিসের ভাষ্য, ‘আমি এটা নিয়ে অনেক ভাবি, কারণ আমি খুব ছোট জায়গায় থাকি, যেখানে আমরা আশা করি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজা যত দিন সম্ভব খোলা থাকবে।’






