এআই মানুষকে সরিয়ে দেয়নি: ৮০ শতাংশ নিয়োগদাতা এখনো কলেজ ডিগ্রিধারীদেরই এগিয়ে রাখছেন, বলছে গ্যালাপ জরিপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানব শ্রমকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে এবং চার বছরের কলেজ ডিগ্রির মূল্য শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণা যত জোরালো হচ্ছে, মার্কিন চাকরির বাজার ততই ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে। গ্যালাপের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ নিয়োগদাতা কলেজ ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেন, এমনকি যেসব পদে ডিগ্রি স্পষ্টভাবে শর্ত নয়, সেখানেও।
জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন নিয়োগদাতার মধ্যে ছয়জন উচ্চশিক্ষার প্রতি উচ্চ মাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছেন। সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও যারা প্রকৃতপক্ষে বেতন-ভাতা দেন, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার মধ্যে এখনো বড় মূল্য দেখছেন বলেই এই তথ্য ইঙ্গিত করে।
জরিপের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি এআই নিয়ে সম্মিলিত আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত ধারণা হলো জেনারেটিভ এআই সাদা-কলার কর্মীদের জায়গা নেবে এবং উচ্চশিক্ষাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে। কিন্তু জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক নিয়োগদাতা মনে করেন এআইয়ের কারণেই আগামী পাঁচ বছরে কলেজ ডিগ্রি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মাত্র এক-চতুর্থাংশ মনে করেন ডিগ্রির মূল্য কমবে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ব্যবসায়িক খাত একই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দুর্লভ হলেও আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় একটি সম্পদে পরিণত হচ্ছে। বর্তমান বাজারের চাহিদার ভিত্তিতেই নিয়োগ ব্যবস্থাপকেরা এমন অবস্থান নিচ্ছেন।
এর একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্বয়ংক্রিয়তার সীমা। কারিগরি ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ যত বেশি স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, মানুষের স্বতন্ত্র গুণগুলোর মূল্য তত বাড়ছে। নিয়োগদাতারা এখন এমন তরুণ পেশাজীবী চাইছেন, যাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ার বুদ্ধিমত্তা, মতবিরোধ সামলানোর ক্ষমতা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের ধৈর্য রয়েছে।
নিয়োগদাতাদের চোখে কলেজ ডিগ্রি শুধু দক্ষতার সনদ নয়; এটি কঠোর পরিশ্রমের প্রমাণও। ডিগ্রি ইঙ্গিত দেয় যে একজন তরুণ বহু বছরের একটি প্রকল্পে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে পারেন, সমালোচনামূলক মতামত গ্রহণ করতে পারেন এবং বৈচিত্র্যময় একটি দলের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারেন—এগুলো পেশাজীবীর মৌলিক গুণ, যা যন্ত্রের পক্ষে অনুকরণ করা সম্ভব নয়।
তবে এই জরিপকে উচ্চশিক্ষা নেতৃত্বের জন্য চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করা হয়েছে। নিয়োগদাতারা এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রতি আস্থা রাখছেন মানেই তাঁরা সব সময় রাখবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। এই তথ্যকে টিউশন ফি বাড়ানো কিংবা রিসোর্ট-ধাঁচের ক্যাম্পাস সুবিধা তৈরির যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভঙ্গুরতার বিরুদ্ধেও সতর্ক থাকতে হবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোর বিতর্কের বদলে আবেগগত স্বস্তিকে অগ্রাধিকার দিলে তারা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করবে, যাঁরা প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত নয়। নিয়োগদাতারা চান সমালোচনামূলক চিন্তক, সবাইকে নিজের সঙ্গে একমত হতে বাধ্য করা কর্মী নয়।
জরিপে আরও দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার প্রতি সবচেয়ে কম আস্থা এসেছে ১০ জনের কম কর্মী আছে এমন ছোট ব্যবসাগুলোর কাছ থেকে। এসব উদ্যোক্তা মার্কিন অর্থনীতির মেরুদণ্ড, এবং তাঁদের পক্ষে ভুল নিয়োগের বিলাসিতা নেই—তাঁদের দরকার তাৎক্ষণিক দক্ষতা। এই দূরত্ব কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়তে এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রকৃত কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে মেলাতে হবে।
সব মিলিয়ে জরিপের বার্তা হলো, প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রে মানুষের প্রাসঙ্গিকতা মুছে ফেলবে—এই ভয় ভিত্তিহীন বলেই ব্যবসায়িক মহল মনে করছে। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, মানুষের মনের বিকাশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সহনশীলতাকে তারা এখনো মূল্য দেয়।
এখন প্রমাণের দায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শৃঙ্খলা বজায় রেখে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে পারলে পরবর্তী প্রজন্মকে আশ্বস্ত করা যাবে যে কর্মক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ—এমনটাই বলা হচ্ছে বিশ্লেষণে।






