মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে নিয়ে জেন-জির এআই মিম: রসিকতা, নাকি রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রকাশ
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশটিতে নানা আলোচনা ও জল্পনা চললেও এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে নানা ব্যঙ্গাত্মক মিম ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।
এসব মিম ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে বড় একটি অংশই তরুণ। প্রথম কিংবা দ্বিতীয় মেয়াদ—কোনো সময়েই ট্রাম্পকে ঘিরে সমালোচনার কমতি ছিল না, এবং বিশ্বরাজনীতির অন্যতম আলোচিত এই নেতাকে নিয়ে বিতর্কও নতুন নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সমালোচনার ধরন ও বিস্তৃতি আগের চেয়ে ভিন্ন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিছক হাস্যরসের আড়ালে এসব মিমের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে তরুণদের ক্ষোভ, হতাশা ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। অর্থাৎ ছোট ছোট ভিডিও আর ব্যঙ্গচিত্র শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; এগুলোতে ফুটে উঠছে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক মনোভাব।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ব্যঙ্গাত্মক বার্তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মনোভাব নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সঙ্গেও এই প্রবণতার তুলনা করছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদ জনমত গঠনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টির শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও এই প্রবণতা নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পকে ঘিরে জেন-জির নতুন মিমগুলোতে ভাষার ভিন্নতাও চোখে পড়েছে। ছোট ছোট ভিডিওতে নানা উপায়ে ট্রাম্পকে বিদ্রূপ করা হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি চরিত্রগুলো ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে অংশ নিচ্ছে। সেখানে ট্রাম্পের প্রশ্নের জবাবে একটি চরিত্রকে বলতে শোনা যায়, ‘তিনি একজন প্রেসিডেন্ট, কিন্তু বোকা মানুষদের জন্য।’
ট্রাম্পের বক্তব্য ও ভাষার ধরন নিয়েও সমালোচনা করছে তরুণ প্রজন্ম। এর অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ইরান যুদ্ধ ঘিরে তার বিভিন্ন মন্তব্য। এআই দিয়ে তৈরি কিছু ভিডিওতে এমন কথাও বলা হচ্ছে, ‘ট্রাম্পের মুখের চেয়েও একটি বন্দুক বেশি নিরাপদ।’
এআই দিয়ে তৈরি আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্প ভোট চাইতে গেলে ভোটাররা তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছেন এবং কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অর্থাৎ শুধু ট্রাম্পকেই নয়, যারা তাকে সমর্থন করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছেন তরুণেরা। সচেতন মহলের ভাষায়, ট্রাম্পকে নিয়ে এসব কেবল জেন-জির রসিকতা নয়, বরং এক ধরনের চপেটাঘাতও।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কোনো প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড যখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন তার জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে এসব মিম কেবল হাস্যরস থাকে না, রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের মাধ্যমও হয়ে ওঠে।
তরুণদের তৈরি এসব মিম ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, ফলে এসব ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এমএস নাও-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহান জোন্স ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, একের পর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তরুণদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই বিশ্লেষকের মতে, এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটকে ‘প্রতারণা’ বা ‘ভুয়া’ বলে অভিহিত করার বিষয়টি তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর আবাসন ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে তরুণ ভোটারদের এই মনোভাব কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।






