এই সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না সন্দেহ আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি নাহিদ ইসলামের
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “বর্তমান জাতীয় সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ১৬ বছর পর নির্বাচন ও নতুন সংসদ গঠিত হলেও সেখানে বিরোধী দলের বক্তব্য এবং জনগণের কণ্ঠস্বরের কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না। বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এই সংসদ আর জনগণের সংসদ নেই।”
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালনকালে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতার মুখে সংসদের মেয়াদ নিয়ে এমন সন্দেহ প্রকাশ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “দেশের যেকোনো শ্রেণির নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।” তার অভিযোগ, সরকারের এই ব্যর্থতা এখন প্রতিদিনের ঘটনায় প্রকাশ পাচ্ছে।
শনিবার সকালে গায়ক আসিফ আকবরের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।” দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম।
একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে জ্বালানিমন্ত্রীরও পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সরকারের ব্যর্থতার দায় নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়কেই নিতে হবে।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগও তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রতিটি বাস ও রুটের গাড়ি থেকে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, এই চাঁদার ভাগ এখনো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভাগাভাগি করে নিচ্ছে।
তার অভিযোগ, দুই দলের এই ভাগাভাগির কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের পকেটের টাকা চলে যাচ্ছে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি সরাসরি সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের ওপর চাপ তৈরি করছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “দেশে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলতে পারে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নামতে হবে। ১৬ বছর ধরে আন্দোলন করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হলেও এখন আর বিকল্প নেই।”
তার অভিযোগ, তারেক রহমান গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। সেই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পুনরুদ্ধারে আবারও রাজপথে নামতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বিরোধী রাজনীতিকে সংসদের বাইরে রাজপথেও সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “জনগণ তাদের কথা সংসদে তুলে ধরার জন্য বিরোধী দলকে পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেখানে জনগণের কথা বলার সুযোগ না থাকায় তারা আবারও মানুষের কাছে ফিরে এসেছেন।” যাত্রাবাড়ীতে গণসংযোগ কর্মসূচিকে সেই ‘মানুষের কাছে ফিরে আসা’র অংশ হিসেবেই তিনি তুলে ধরেন।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে যে নাটক ও প্রহসন চলছে, তা বন্ধ করতে হবে। গণভোটের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।” একই প্রসঙ্গে তিনি সংসদে পাস হওয়া কর্তৃত্ববাদী আইনগুলো পরিবর্তনের দাবিও জানান।
তিনি জুলাই গণহত্যায় যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি ওসমান হাদীর হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। যেসব মামলার রায় হয়েছে, সেগুলো অবিলম্বে কার্যকর করারও দাবি জানান এনসিপির আহ্বায়ক।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দলীয়করণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আলুচাষিরা লোকসান দিয়ে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। হিমাগারে আলু সংরক্ষণে ৮৬০ টাকা খরচ হলেও তা ৬২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।” কৃষকের এই লোকসানের চিত্র তুলে ধরে তিনি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেন।
সারের ডিলারশিপে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুরে ৫৭ জনকে সারের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের সারের ব্যবসা করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর রাজনৈতিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচনে তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে হারানো হয়েছে। তবে জনগণের মন থেকে তাকে মুছে ফেলা যায়নি। এখন থেকে পুরো ঢাকা মহানগর দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও এনসিপি সক্রিয় থাকবে।” কোথাও চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা দখলদারিত্বের ঘটনা ঘটলে তাদের জানাতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি গণসংযোগ কর্মসূচি চালিয়ে যান।




