ফ্রান্সজুড়ে দ্বিতীয় দফা বিক্ষোভ: ১৩৬ স্থানে কর্মসূচি, নঁতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় আবার নেমে এসেছেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। শনিবার শিক্ষার্থী, ট্রেড ইউনিয়ন এবং সরকারবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর আয়োজনে দ্বিতীয় পর্যায়ের এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। দিনের শুরুতেই রাস্তায় নেমে আসেন বিপুলসংখ্যক মানুষ, আর দেশজুড়ে ১০০টিরও বেশি জায়গায় বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্য দিয়ে। তারা স্কুলের পরিবেশ উন্নত করা এবং কর্মী সংকট দূর করার দাবি জানিয়েছিল। পরবর্তীতে কিছু জায়গায় এই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। শনিবারের বিক্ষোভে সেই শিক্ষার্থী আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন ও বিরোধী দলগুলো, যার পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ক্ষোভ।
আগের সপ্তাহগুলোতে কিছু বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় এবার অতিরিক্ত কয়েক হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দেশের অনেক জায়গায় কারফিউ জারি করা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে। তার পরও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একাধিক শহরে মানুষ জড়ো হয়েছেন।
ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ প্যারিসের কেন্দ্রে জনতার সঙ্গে পদযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। ফরাসি রাজধানীতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরপরই এই রাজনীতিবিদকে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে ধরতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা পতাকা ওড়ান, বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন এবং মেগাফোনে স্লোগান দিতে থাকেন — এভাবেই বিশাল মিছিল এগিয়ে চলতে শুরু করে।
পশ্চিম ফ্রান্সের নঁত শহরে পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। সেখানে আয়োজিত এক বিক্ষোভে ফরাসি দাঙ্গা পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় ঘেরা অবস্থায় দেখা গেছে। নঁতে পুলিশ জানিয়েছে, একটি অননুমোদিত সমাবেশের চারপাশে থাকা নিষিদ্ধ এলাকার বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টার পর বিক্ষোভকারীদের দমাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়েছে।
বোর্দো শহরেও নিষেধাজ্ঞা মানেননি বিক্ষোভকারীরা। সব ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এবং ট্রাম চলাচল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা ‘প্লাস দে লা বুর্স’-এ জড়ো হয়েছেন। শহরটির এই জমায়েত দেখিয়ে দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলনের বিস্তার থামেনি।
জিরোন্দ অঞ্চলের ‘সিজিটি-কমার্স অ্যান্ড সার্ভিসেস’ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ব্রিজিট কুদের্ক বলেন, “বিক্ষোভ নিষিদ্ধ হোক বা না হোক, আমরা হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশে থাকব এবং তাদের একা ফেলে আসব না। আমরা অভিভাবক, একসময় আমরাও তরুণ ছিলাম, আবার আমরা শ্রমিকও।” তাঁর এই বক্তব্যে শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি শ্রমিক সংগঠনগুলোর সংহতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
নিস শহরেও একই চিত্র দেখা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সব ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ‘প্লাস মাসেনা’-তে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন; পুলিশ তাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে শহরভেদে পুলিশের কৌশলও ছিল ভিন্ন — কোথাও কাঁদানে গ্যাস, কোথাও শুধু সরে যাওয়ার নির্দেশ।
তবে আগের সপ্তাহের তুলনায় এবারের অংশগ্রহণ কমেছে বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরঁ নুনেস জানিয়েছেন, সারা দেশে বিভিন্ন মিছিলে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন, যেখানে গত শনিবার এই সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, কর্তৃপক্ষ ১৩৬টি স্থানে জনসমক্ষে বিক্ষোভ কর্মসূচি শনাক্ত করেছে, যা আগের সপ্তাহান্তের ২৬৪টি কর্মসূচির তুলনায় কম। কর্মসূচির সংখ্যা ও অংশগ্রহণ — দুটোই কমলেও শনিবারের বিক্ষোভ দেশজুড়ে একযোগে হয়েছে এবং প্যারিসসহ প্রধান শহরগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে।
বিক্ষোভের মূল দুটি ধারা এখন স্পষ্ট — একদিকে স্কুলের পরিবেশ ও কর্মী সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন ও বিরোধী দলগুলোর বৃহত্তর ক্ষোভ। এই দুই ধারা এক হয়ে যাওয়াতেই আন্দোলনটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় রূপ নিয়েছে।
এখন নজর থাকবে পরের সপ্তাহগুলোর দিকে — অংশগ্রহণ কমতে থাকলে সরকারের ওপর চাপও কমতে পারে, আর আন্দোলন আবার চাঙা হলে নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশি ব্যবস্থা নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হবে। আপাতত শনিবারের চিত্র বলছে, সংখ্যায় কমলেও ফ্রান্সের রাস্তার আন্দোলন এখনো থামেনি।





