মিথ্যা বলার সময় মস্তিষ্কে বাড়তি চাপ পড়ে কেন, চার ধাপের মডেলে যা বলছেন গবেষকেরা
কেউ আপনার সামনে বসে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠে দ্বিধা নেই, চোখেমুখেও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ছে না। কিন্তু মনে খটকা — তিনি কি সত্যিই সত্যি বলছেন, নাকি নিখুঁতভাবে মিথ্যা সাজিয়ে যাচ্ছেন? এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই বলেই জানাচ্ছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তবে মিথ্যা বলার সময় মানুষের মস্তিষ্ক ও আবেগে কী ঘটে, তা বোঝার চেষ্টা করলে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর কিছু সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
প্রথমেই যে বিষয়টি গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, মিথ্যা ধরার সহজ কোনো সূত্র নেই। কেউ মিথ্যা বলার সময় অস্থির হয়ে পড়েন, কেউ আবার স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। তাই শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে, কথা বলার ধরন দেখে কিংবা শরীরী ভাষা খেয়াল করে কাউকে মিথ্যাবাদী বলে দেওয়া ঠিক নয়। বাইরের আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই অভ্যাস অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের মনোবিজ্ঞানী সুসান ক্রাউস হুইটবোর্ন তাঁর এক লেখায় মিথ্যা বলার পেছনের মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে, সত্য বলার তুলনায় মিথ্যা বলার জন্য অনেক সময় বেশি মানসিক পরিশ্রম করতে হয়। মিথ্যা বলা তাই শুধু মুখের কথা নয়, মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি কাজের চাপও বটে।
সত্য বলার সময় সাধারণত নিজের জানা ঘটনা বা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেই চলে। কিন্তু মিথ্যা বলার সময় হিসাবটা একটু আলাদা। কী বলবেন, কী গোপন করবেন, আগের কথার সঙ্গে নতুন বক্তব্য মিলছে কি না — এসব একসঙ্গে সামলাতে হয়। আবার এমন কিছু বলে ফেললে চলবে না, যা পরে নিজের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। এই একসঙ্গে অনেক হিসাব সামলানোই মিথ্যাকে কঠিন করে তোলে।
গবেষকেরা এই বাড়তি মানসিক চাপকে মিথ্যা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছেন। মিথ্যা বলার সময় মানুষকে নিজের বক্তব্যের ওপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। মনোবিজ্ঞানে এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘রেসপন্স ইনহিবিশন’ — অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে যা বলতে ইচ্ছা করছে, তা নিয়ন্ত্রণ করে পরিকল্পিত উত্তর দেওয়া। সত্য চেপে রেখে সাজানো উত্তর দেওয়ার এই নিয়ন্ত্রণই মস্তিষ্ককে বেশি খাটায়।
তবে সবাই একইভাবে মিথ্যা বলেন না। কেউ আগে থেকেই গল্প সাজিয়ে রাখেন, কেউ পরিস্থিতি বুঝে উত্তর তৈরি করেন। ফলে মিথ্যা বলার মানসিক চাপও ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে। আগে থেকে সাজানো মিথ্যায় চাপ এক রকম, হঠাৎ প্রশ্নের মুখে তৈরি করা মিথ্যায় চাপ আরেক রকম — এই পার্থক্যটাও গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।
মিথ্যা বলার সময় শুধু মস্তিষ্কের বাড়তি পরিশ্রমই নয়, আবেগও ভূমিকা রাখে। কেউ অপরাধবোধে ভুগতে পারেন, কেউ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারেন। আবার কেউ মিথ্যা বলে সাময়িক সন্তুষ্টিও অনুভব করতে পারেন। আবেগের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়াই মিথ্যা বলার অভিজ্ঞতাকে একেকজনের কাছে একেক রকম করে তোলে।
বিশেষ করে নিজের অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে মিথ্যা বলার সময় নার্ভাসনেস বা মানসিক উত্তেজনা বেড়ে যেতে পারে। তবে অভিজ্ঞ মিথ্যাবাদীরা নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে যেতে পারেন। তাই কাউকে উদ্বিগ্ন দেখালেই তিনি মিথ্যা বলছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সত্য বলার সময়ও মানুষ ভয়, চাপ কিংবা অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন — এই সতর্কতাটা গবেষকেরা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।
২০২৬ সালে জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তাবেয়া ভ্যাখটারশয়জার ও ক্রিস্টিনা সুচোৎস্কি মিথ্যা বলার মানসিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে একটি চার ধাপের মডেল নিয়ে আলোচনা করেন। এর নাম ‘অ্যাকটিভেশন-ডিসিশন-কনস্ট্রাকশন-অ্যাকশন’। এই মডেল মিথ্যা বলার পুরো প্রক্রিয়াটিকে ধাপে ধাপে ভেঙে বোঝার একটি কাঠামো দিয়েছে।
সহজভাবে বললে, মিথ্যা বলার প্রক্রিয়াটি এভাবে এগোতে পারে — প্রথমে সত্যটি মনে সক্রিয় হয়, ব্যক্তি জানেন আসলে কী ঘটেছে। এরপর তিনি ঠিক করেন, সত্য প্রকাশ করবেন নাকি তা গোপন করবেন। তারপর সত্যের বদলে কী বলবেন, কীভাবে বলবেন এবং বক্তব্যটি কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য করবেন, তা সাজান। সবশেষে তৈরি করা বক্তব্যটি অন্যের সামনে উপস্থাপন করেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তথ্য মনে রাখা, উত্তর তৈরি করা এবং নিজের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রয়োজন হয়, ফলে মিথ্যা বলা অনেক সময় সত্য বলার চেয়ে বেশি মানসিক পরিশ্রমের দাবি রাখে।
গবেষকেরা দুটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মিথ্যা বলা ও সত্য বলার অভিজ্ঞতা তুলনা করেন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি কাল্পনিক চুরির ঘটনায় যুক্ত করা হয়েছিল। এক পরীক্ষায় ইউএসবি ড্রাইভ এবং অন্য পরীক্ষায় এক হাজার ইউরো চুরির পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এরপর তাঁদের এমন প্রশ্ন করা হয়, যার মাধ্যমে সত্য বলা ও মিথ্যা বলার সময় প্রতিক্রিয়ার গতি এবং আবেগের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, সত্য বলার তুলনায় মিথ্যা বলতে অংশগ্রহণকারীদের বেশি সময় লেগেছে। একই সঙ্গে তাঁরা মিথ্যা বলার সময় বেশি ভয়, নার্ভাসনেস ও মানসিক অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন।
তবে এই গবেষণার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা জানতেন, গবেষকেরা পুরো ঘটনা সম্পর্কে অবগত। বাস্তব জীবনের পরিস্থিতি এর চেয়ে আলাদা হতে পারে। তাই গবেষণাগারের ফলাফল দিয়ে প্রতিদিনের সব মিথ্যা বিচার করা যাবে না। তবু এই গবেষণা একটি বিষয় পরিষ্কার করে — মিথ্যা বলা মস্তিষ্কের জন্য বাড়তি কাজ, আর সেই বাড়তি কাজের ছাপ সময় ও আবেগে ধরা পড়তেই পারে, যদিও তা কখনোই এককভাবে কাউকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে না।





