হাতে স্মার্টফোন, পর্দায় প্রিয় মুখ — তবু কেন কাটে না বয়স্কদের নিঃসঙ্গতা
স্মার্টফোন হাতে থাকলেই কি নিঃসঙ্গতা কাটে? বয়স্কদের জীবন নিয়ে গবেষণার বার্তা হলো, প্রযুক্তি দূরত্ব কমাতে পারে, সম্পর্কও ধরে রাখতে পারে, তবে সামনাসামনি সঙ্গের অভাব সব সময় পূরণ করতে পারে না পর্দার যোগাযোগ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে নানা দিক থেকে বদল আসে। কর্মজীবন থেকে অবসর, জীবনসঙ্গী বা বন্ধুদের হারানো, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা সন্তানদের দূরে বসবাস — এসব কারণে অনেক বয়স্ক মানুষের সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে স্মার্টফোন তাদের জন্য যোগাযোগের নতুন দরজা খুলে দেয়। ভিডিও কল, মেসেজ কিংবা অনলাইনে বিনোদনের মাধ্যমে তারা দূরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকলেই কি নিঃসঙ্গতা দূর হয়?
গবেষকেরা মনে করিয়ে দেন, একা থাকা আর নিঃসঙ্গ বোধ করা এক নয়। কেউ একা থেকেও সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। আবার পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা পরিচিত মানুষের মধ্যে থেকেও কেউ নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারেন।
কারণ নিঃসঙ্গতা শুধু আশপাশে মানুষের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; সম্পর্কের মধ্যে কতটা আন্তরিকতা, বোঝাপড়া ও মানসিক সংযোগ রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যায় যোগাযোগ বেশি হলেই যে মনের দূরত্ব কমবে, তা নয়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত কথা হলেও কারো কারো মনে হতে পারে, আগের মতো একসঙ্গে সময় কাটানো হচ্ছে না। ফোনে খোঁজখবর নেওয়া আর পাশে বসে কথা বলা এক অভিজ্ঞতা নয়। ফলে যোগাযোগের সুযোগ থাকলেও সান্নিধ্যের অভাব থেকে যেতে পারে।
ভিডিও কলের বড় সুবিধা হলো, দূরে থেকেও প্রিয়জনের মুখ দেখা যায়, তার কথা শোনা যায় এবং অভিব্যক্তি বোঝা যায়। যাদের চলাফেরায় অসুবিধা রয়েছে কিংবা পরিবারের সদস্যরা অন্য শহর বা দেশে থাকেন, তাদের জন্য এটি যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
গবেষণায় ভিডিও কলের তিনটি ভূমিকা উঠে এসেছে। প্রথমত, এটি সরাসরি দেখা করার পাশাপাশি যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, দূরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, কখনো কখনো এটি সামনাসামনি সাক্ষাতের বিকল্প হয়ে ওঠে।
প্রথম দুটি ক্ষেত্রে ভিডিও কল সম্পর্কের সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তৃতীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। কারণ পর্দায় মানুষটিকে দেখা গেলেও তার পাশে বসে সময় কাটানো কিংবা বাস্তব সান্নিধ্যের অনুভূতি পাওয়া যায় না। কারো কারো কাছে ভিডিও কল অনেকটা ‘কথা বলা পোস্টকার্ডের’ মতো মনে হতে পারে — কথা হচ্ছে, মুখও দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব উপস্থিতির অনুভূতি তৈরি হচ্ছে না।
সামনাসামনি দেখা করার সুযোগ কমে গিয়ে যোগাযোগ যদি শুধু ভিডিও কলেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কেউ কেউ অবহেলিত হওয়ার আশঙ্কাও অনুভব করতে পারেন। তাদের মনে হতে পারে, পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ রাখছেন ঠিকই, কিন্তু একসঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহ বা সুযোগ কমে যাচ্ছে। তাই ভিডিও কলের কার্যকারিতা শুধু কতবার কথা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না; যোগাযোগটি কতটা আন্তরিক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
স্মার্টফোনে গান শোনা, সিনেমা দেখা কিংবা বিভিন্ন ভিডিও উপভোগ করা বয়স্কদের অবসর কাটাতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিনোদন আর সামাজিক যোগাযোগ এক নয়। দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটালেও মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো মানুষ না থাকলে নিঃসঙ্গতা থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে ভিডিও কল বা মেসেজে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া কিংবা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া অর্থবহ যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গবেষণার মূল বার্তা হলো, ভিডিও কলকে সামনাসামনি যোগাযোগের বিকল্প না বানিয়ে পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করাই ভালো। বয়স্কদের প্রযুক্তি ব্যবহারে অসুবিধা হলে পরিবারের সদস্যরা ভিডিও কল চালু করা, অ্যাপ ব্যবহার শেখানো কিংবা অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন করে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যোগাযোগ যেন কেবল নিয়মরক্ষার বিষয় হয়ে না দাঁড়ায় — মন দিয়ে কথা শোনা, পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সম্ভব হলে সরাসরি সময় কাটানোও প্রয়োজন। স্মার্টফোন দূরত্ব কমাতে পারে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা কমাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি চাই আন্তরিক সম্পর্ক ও বাস্তব সঙ্গ।




