পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধ: হেবরনে ঘরছাড়া ২ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি, ১৫ এলাকায় অভিযান
অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবরোধ জারি করে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। হেবরন শহরে অন্তত ২ হাজার ফিলিস্তিনিকে তাঁদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত হওয়ার পর পশ্চিম তীরজুড়ে অভিযান জোরদার করেছে দেশটির বাহিনী, আর হেবরনের বাসিন্দাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গভীর রাতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাঁদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েলি সেনারা। ফলে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাননি তাঁরা। অন্যত্র যাওয়ার মতো জায়গাও তাঁদের হাতে খুব কম ছিল — হঠাৎ এই নির্দেশে শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হেবরনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি জানান, ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান ও তল্লাশির কারণে ২ হাজার ২০০ মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও নিশ্চিত করেন, প্রায় ২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হেবরনে হামাস-সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের নিজেদের এলাকায় ফিরতে দেওয়া হবে না।’
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। সেদিন ফিলিস্তিনের দুই বন্দুকধারী ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি রিজার্ভ ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এতে ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত হন, ওই দুই ফিলিস্তিনি হামলাকারীও নিহত হন। এ ঘটনার পর থেকে পশ্চিম তীরে শত শত অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী, আর হামলার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘পূর্ণাঙ্গ অবরোধ’ জারির নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মেয়র আল-জাবারি জানান, হেবরনের বাসিন্দারা শহরে প্রবেশ করতে পারছেন না, আবার শহর থেকে বের হতেও পারছেন না। এদিকে হেবরনে ফারশ আল-হাওয়া চেকপোস্টের কাছে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে শব্দবিস্ফোরক গ্রেনেড ছোড়ে ইসরায়েলি সেনারা — ওই সময় সাংবাদিকেরা এলাকায় বাহিনীর অভিযান এবং বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর ও যানবাহন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ধারণ করছিলেন।
গত শনিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের অন্তত ১৫টি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। অভিযানের লক্ষ্যবস্তু এলাকাগুলোর মধ্যে উত্তরে জেনিন ও নাবলুস, মধ্যাঞ্চলে রামাল্লা, আল-বিরেহ, বিরজেইত ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম এবং দক্ষিণে বেথলেহেম রয়েছে।
ফিলিস্তিনি বন্দি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে প্রায় ৭০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় জেনিন গভর্নরেটের কয়েকটি শহরে অভিযানে দুজন আহত হন; জেনিনের দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে পৃথক দুটি ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আজ রোববার ভোরে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, হেবরনের উত্তরে হালহুল এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নয়জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ছয়জন শিশু।
রোববার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত পশ্চিম তীরের অধিকাংশ এলাকায় ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। মঙ্গলবার ইসরায়েলের নির্বাচনের দিন পশ্চিম তীরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সব সীমান্তপথ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হবে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের পদক্ষেপকে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ বলে অভিহিত করেছে। বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, গোটা এলাকার বাসিন্দাদের জোর করে উচ্ছেদ করা এবং ফিলিস্তিনি শহরগুলো অবরুদ্ধ করে চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে তারা। হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, দখলদার বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের এই অভিযান ও উত্তেজনা বাড়ানোর পদক্ষেপ কেবল আরও ক্ষোভের জন্ম দেবে।
হেবরন শহরে প্রায় ২ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন, আর হেবরন গভর্নরেটজুড়ে বাস করেন আরও প্রায় ৬ লাখ মানুষ — জনসংখ্যার দিক থেকে এটি পশ্চিম তীরের সবচেয়ে বড় গভর্নরেট। হেবরনভিত্তিক ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইসা আমরো বলেন, হেবরন গভর্নরেটের প্রায় ৮ লাখ ফিলিস্তিনি এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন, সকাল থেকে প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথ বন্ধ, আর পুরো শহরজুড়েই আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসরায়েলের আসন্ন রাজনীতিও। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন। আল জাজিরার পশ্চিম তীরবিষয়ক সংবাদদাতা নুর ওদেহের মন্তব্য, ফিলিস্তিনিদের হামলার ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন ইসরায়েলি রাজনীতিকেরা — জনমত জরিপে নেতানিয়াহু, তাঁর দল লিকুদ পার্টি ও ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোটের শরিকেরা পিছিয়ে রয়েছেন। ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য একটি ‘বড় চমক’ অপেক্ষা করছে।






