অরলেয়াঁয় প্রথম প্রচার সমাবেশে নিজেকে ফ্রান্সের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরলেন মারিন ল্য পেন
ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন রবিবার প্যারিসের দক্ষিণে অরলেয়াঁয় তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচার সমাবেশে নিজেকে ফ্রান্সের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধী কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি এই ভূমিকায় নিজেকে উপস্থাপন করেন।
২০২৭ সালের এপ্রিলে নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে ল্য পেন এগিয়ে রয়েছেন। সামাজিক অস্থিরতা ও আসন্ন ঋণসংকটের মুখে থাকা ফ্রান্সকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘আজ যে শব্দগুলো মনে আসে সেগুলো ধ্বংস, পতন, দাঙ্গা এমনকি বিশৃঙ্খলা হলেও আমরা আমাদের জনগণ ও ফ্রান্সে বিশ্বাস করি।’
এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেওয়া ভাষণে ল্য পেন হাজার হাজার সমর্থককে বলেন, তাঁর লক্ষ্য ‘বিপ্লব’ নয়, বরং ক্ষমতায় ‘প্রকৃত পরিবর্তন’, যা দেশে নতুন ‘রেনেসাঁ’ বা নবজাগরণের সূচনা করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা বলছি না: আগে ভালো ছিল। আমরা বলি: আগে ভালো ছিল এবং আগামীকাল আরও ভালো হবে।’
ল্য পেন তাঁর পরিচিত প্রতিশ্রুতিগুলোও তুলে ধরেন। ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সে জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দেশের সীমান্ত শক্তিশালী করা এবং অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভ থেকে সৃষ্ট অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে ল্য পেনের দল ন্যাশনাল র্যালি ফ্রান্সে বিভাজন আরও গভীর করেছে বলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অভিযোগের জবাব গত কয়েক দিন ধরে দিয়ে আসছেন ল্য পেন ও তাঁর মিত্ররা। ভাষণে চারবারের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ল্য পেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকেন এবং তাঁর দলকে ফরাসি নাগরিকদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেওয়ার দল হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমার সুরক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি সবার উপকারে আসবে।’
ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্স একসঙ্গে একাধিক সংকটের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় বাজেট পাসে জটিলতা এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ ও ঘাটতি। এই কঠিন পরিস্থিতি বাজারকে উদ্বিগ্ন করেছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।
ন্যাশনাল র্যালির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ল্য পেন তাঁর ভাষণকে নিজেকে প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় তুলে ধরতে এবং তাঁকে সমর্থন করতে দ্বিধাগ্রস্ত ভোটারদের আশ্বস্ত করতে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মানুষ মূলত আমাদের ধারণার সঙ্গে একমত, কিন্তু কেউ কেউ এখনো মনে করেন আমাদের ভোট দেওয়া একটা ঝুঁকি।’
সমাবেশটি ছিল শক্তি প্রদর্শনও। অরলেয়াঁর একটি সম্মেলন হলে ৮ হাজার ৫০০-র বেশি সমর্থক জড়ো হন, অনেকের হাতে ছিল ফরাসি পতাকা এবং তাঁরা ‘মারিন, প্রেসিডেন্ট!’ স্লোগান দিচ্ছিলেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি পলিটিকোর সর্বশেষ পোল অব পোলস অনুযায়ী, আজ নির্বাচন হলে ল্য পেন ৩৪ শতাংশ ভোট পেতেন, যেখানে মধ্য-ডানপন্থী প্রার্থী এদুয়ার ফিলিপ পেতেন ১৬ শতাংশ এবং কট্টর বামপন্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ পেতেন ১৫ শতাংশ। বেশির ভাগ জরিপে দেখা গেছে, প্রথম পর্বে কোনো প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে দ্বিতীয় পর্বে ল্য পেন জয়ী হবেন।
কট্টর ডানপন্থী দলের নেতারা সপ্তাহান্তে অরলেয়াঁয় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দুই দিনের সম্মেলন করেন, সেখানে পুলিশি তল্লাশি ও দেহতল্লাশি জোরদার করা হয়। শনিবার প্যারিসের কেন্দ্রে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানের বিরোধিতায় হাজার হাজার বামপন্থী বিক্ষোভকারী জড়ো হন, আর সারা দেশে বিক্ষোভে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। এর এক সপ্তাহ আগে ফ্রান্সজুড়ে সমাবেশে লুটপাট ও দাঙ্গা হয়েছিল।
ল্য পেনের ভাষণের আগে জনতাকে উদ্দেশ করে ন্যাশনাল র্যালির সভাপতি জর্দান বারদেলা বলেন, ‘ফ্রান্স প্রকৃত সহিংসতায় ডুবে যাচ্ছে, যা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ না নিলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার একমাত্র সমাধান হিসেবে ন্যাশনাল র্যালিকেই দেখা যাচ্ছে।’
শুক্রবার প্যারিসের শহরতলি ত্রাপে এক ব্যক্তি পথচারীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালালে একজন নিহত ও ১২ বছর বয়সী এক মেয়েসহ পাঁচজন আহত হন। এরপর ফ্রান্স এমনিতেই উত্তাল ছিল। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঘটনাটিকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী হামলা’ বলে নিন্দা জানান।
সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা অলিভিয়ে ফোর রবিবার বলেন, ত্রাপের হামলার জন্য ন্যাশনাল র্যালির ‘ভারী দায়’ রয়েছে, কারণ তারা এমন এক আবহ তৈরি করেছে যাতে মনে হয় ‘আমাদের ওপর আগ্রাসন হচ্ছে, এক ধরনের মহা প্রতিস্থাপন ঘটছে।’ ন্যাশনাল র্যালি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং উল্টো কট্টর বামপন্থীদের সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ করেছে।



