যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মাদক কারবারি জুয়েল ও স্ত্রীর ২৪ ব্যাংক হিসাবে ১৩ কোটি টাকার লেনদেনের সন্ধান

কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাদক কারবারি জুয়েল রানা (৩৪)। তাঁর মাদক কারবারের অর্থ কোথায় গেছে এবং কীভাবে সম্পদ গড়েছেন, তা খুঁজতে গিয়ে বিপুল লেনদেনের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অনুসন্ধানে জুয়েল ও তাঁর স্ত্রী সালমা জাহানের (৩০) নামে ২৪টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান মিলেছে। এসব হিসাবে গত আট বছরে লেনদেন হয়েছে ১৩ কোটি ৪ লাখ ১৬ হাজার ২৮৭ টাকা।
এই দম্পতির নামে জমি, বাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদেরও খোঁজ পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জুয়েল ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তি জব্দের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান। তদন্ত শেষে স্বামী-স্ত্রী দুজনের বিরুদ্ধেই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জুয়েলের নামে থাকা ১২টি ব্যাংক হিসাবে গত ৯ বছরে ৬ কোটি ১৮ লাখ ৩ হাজার ৩১৭ টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে চারটি চলতি হিসাব, তিনটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব এবং পাঁচটি সঞ্চয়ী হিসাব। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী সালমা জাহানের ১২টি ব্যাংক হিসাবে গত ৮ বছরে লেনদেন হয়েছে ৬ কোটি ৮৬ লাখ ১২ হাজার ৯৭০ টাকা।
জুয়েলের নামে দুটি বাড়িসহ ছয়টি জমির তথ্য পেয়েছে ডিএনসি। দলিলে এসব সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান বাজারে এগুলোর দাম কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। এ ছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একটি পেট্রলপাম্প এবং ঢাকায় আরও দুটি বাড়ি থাকার তথ্য রয়েছে, যদিও প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব সম্পদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সালমা জাহানের নামে থাকা পাঁচটি জমির দলিলমূল্য ২২ লাখ ৬ হাজার টাকা।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, জুয়েলের নামে একটি আয়কর ফাইল থাকলেও ব্যাংক হিসাবগুলোতে এত অর্থের লেনদেনের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে লেনদেন এবং তাঁর নামে জমি কেনার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। অবৈধ অর্থের লেনদেনের জন্য জুয়েল স্ত্রীর নামে হিসাব খুলেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জুয়েলের সম্পদের বড় অংশই হেরোইন কারবারের অর্থে গড়ে উঠেছে।
জুয়েল রানা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া মালবাগডাঙ্গা গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে। ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তাঁর পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বেলেপুকুর মহল্লার একটি বাড়িতে বসবাস করে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, কিশোর বয়সে সীমান্ত এলাকা থেকে টাকার বিনিময়ে হেরোইন বহনের মধ্য দিয়ে মাদক কারবারে যুক্ত হন জুয়েল। পরে নিজেই এই ব্যবসা শুরু করেন। ভারত থেকে সীমান্তপথে হেরোইন এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি সরবরাহ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ৯টি মাদক মামলা রয়েছে; এসব মামলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা, মিরপুর থানা, পল্টন থানা ও নাটোর সদর থানায় রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলে হেরোইনের বড় সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।
২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর জুয়েলের বেলেপুকুর ও বালুবাগানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৯৫০ গ্রাম হেরোইন ও ইয়াবাসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিএনসির একটি দল। গ্রেপ্তারের ২৮ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদের প্রভাবে জামিন পেয়েছিলেন জুয়েল। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি ওদুদের বাসায় গেলে সাবেক সংসদ সদস্য তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন; ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে তা দেখা যায়।
২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর একটি মাদক মামলায় জুয়েল রানাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত। রায়ের পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। গত মার্চে সৌদি আরবে ওমরাহ পালন শেষে মধ্যপ্রাচ্যের আরও তিনটি দেশ ভ্রমণ করেন। পরে ২২ সেপ্টেম্বর রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জুয়েল কারাগারে থাকলেও উচ্চ আদালত থেকে তাঁকে জামিনে মুক্ত করতে সহযোগীরা তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁর মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে, এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরাই এই সিন্ডিকেটের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।




