পাঁচ বছরে সামুদ্রিক মাছ আহরণ কমেছে ১৬.৫৭ শতাংশ, মোট উৎপাদনে সমুদ্রের অংশ নেমেছে ১১ শতাংশে
বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশে সামুদ্রিক মাছ আহরণে ধারাবাহিক পতন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে সামুদ্রিক মাছ আহরণ কমেছে ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
দেশের মোট মাছ উৎপাদনে সমুদ্রের অবদানও কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ দশমিক ১২ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ক্ষুদ্র ও প্রথাগত নৌযান থেকে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ করা হলেও পরের অর্থবছরে তা কমে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৬৬১ টনে দাঁড়ায়। একই সময়ে শিল্পভিত্তিক ট্রলারের আহরণ ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টন থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫১ টন হয়েছে।
আহরণে এই ভিন্ন প্রবণতা মাছ ধরার এলাকা ও পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। বড় ট্রলার অগভীর পানিতে মাছ ধরলে ক্ষুদ্র জেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ে, একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
এ খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো সামুদ্রিক মাছের মজুত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি। কোন প্রজাতির মাছ কোথায় কত পরিমাণে রয়েছে এবং কতটুকু আহরণ করলে মজুত পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হচ্ছে।
এর ফলে টুনার মতো গভীর সমুদ্রের মাছের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই এবং এ খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি মূল্যায়নেও অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে। আধুনিক মাছ ধরার প্রযুক্তি, উপযোগী নৌযান, সংরক্ষণ সুবিধা ও দক্ষ জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রজাতিভিত্তিক গবেষণা এবং মাছ অবতরণকেন্দ্রে তথ্য সংগ্রহের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সংকটের সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও যুক্ত হচ্ছে। পানির তাপমাত্রা ও অম্লতার পরিবর্তন, দূষণ এবং উপকূলীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মাছের আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, অবৈধ মাছ আহরণ এবং সমুদ্রে পরিত্যক্ত জালে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আটকা পড়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রে পরিত্যক্ত জাল অপসারণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। অতিরিক্ত আহরণ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সীমিত সক্ষমতা ও নজরদারির দুর্বলতা সংকটকে আরও জটিল করছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই অর্থবছরে মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ আয় পুরো মৎস্য খাতের রপ্তানি আয়ের হিসাব; শুধু সামুদ্রিক মাছের নয়।
আহরণের নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মাছের সরবরাহ ও বাজারদামের পাশাপাশি উপকূলীয় জেলেদের আয়, কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই সামুদ্রিক মাছের মজুত অনুযায়ী আহরণনীতি নির্ধারণ, বিধিনিষেধ কার্যকর করা এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সক্ষমতা বাড়ানো এখন মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।



