বছরের প্রথমার্ধে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে অর্ধেকের বেশি: দোহায় প্রকল্পের তালিকা তুলে ধরল ইনভেস্ট বাংলাদেশ, ঝুঁকি ভাগাভাগির প্রস্তাব আশিক চৌধুরীর

দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশ থেকে আসা নতুন মূলধন আগের বছরের একই সময়ের অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে কাতারের রাজধানী দোহায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পের একটি তালিকা তুলে ধরেছে সরকারের বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে সরকারি জমিতে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, বন্দর, প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং মাতারবাড়ী গ্রিন ডকইয়ার্ড।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের আয়োজনে দোহায় চলছে ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম ২০২৬। সোমবার (২৬ অক্টোবর) ফোরামের সেন্টার স্টেজে ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ: দ্য বিলিয়ন-ডলার অপরচুনিটি হাইডিং ইন প্লেইন সাইট’ শীর্ষক একটি অধিবেশন হয়। দোহার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ২০ মিনিটের এই অধিবেশনে প্রকল্পগুলো উপস্থাপন করেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বে থাকা সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী এবং বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার প্রায় ১০০ জন প্রতিনিধি অধিবেশনে অংশ নেন। তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কোনো প্রকল্পে চূড়ান্ত চুক্তি বা বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির তথ্য নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ৭৯ কোটি ৪২ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ১১০ কোটি ৪২ লাখ ডলার। অর্থাৎ নিট এফডিআই কমেছে ২৮ শতাংশ।
বড় পতন হয়েছে নতুন বিনিয়োগে, অর্থাৎ বিদেশ থেকে আসা নতুন মূলধনে। প্রথম ছয় মাসে নতুন মূলধন এসেছে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩৪ কোটি ৫২ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ কম।
এ সময়ে আসা মোট নিট এফডিআইয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশই এসেছে দেশে ব্যবসারত বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগকারীদের চেয়ে পুরোনো বিনিয়োগকারীরাই এখন মূল ভরসা।
অথচ গত বছর চিত্র ছিল ভিন্ন। আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এফডিআই আগের বছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১৭৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছিল। তবু দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ৩ হাজার ৮৯০ কোটি ডলারের তুলনায় তা সামান্য। পাকিস্তানের চেয়েও তা কিছুটা কম।
অর্থনীতিবিদেরা নতুন বিনিয়োগ কমার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন। আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ ‘বি+’ মান রাখলেও পূর্বাভাস দিয়েছে ‘নেতিবাচক’। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ গত জুনে মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এসব নেতিবাচক বার্তা দেয় বলে মনে করেন তারা।
এই ঝুঁকির প্রশ্নটিই ফোরামে তুলেছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বিনিয়োগবিষয়ক এক মন্ত্রিপর্যায়ের গোলটেবিলে তিনি প্রস্তাব দেন, বিনিয়োগ গ্যারান্টি ও রপ্তানি ঋণের মডেলে বিনিয়োগের ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা বিবেচনা করা হোক। উদীয়মান অর্থনীতিতে বিনিয়োগের উন্নয়নমূলক প্রভাবকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশের সফল বিনিয়োগের উদাহরণ আরও বেশি করে তুলে ধরতে আঙ্কটাডের প্রতিও অনুরোধ জানান তিনি।
উপস্থাপনায় নাহিয়ান রহমান রচি বাংলাদেশের তিনটি সুবিধার কথা বলেন: তরুণ কর্মশক্তি, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং বড় অভ্যন্তরীণ বাজার। প্রচলিত তৈরি পোশাকের বাইরে ইলেকট্রনিকস, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়।
নাহিয়ান রহমান বলেন, প্রকল্পগুলোতে কীভাবে অংশ নেওয়া যায়, তা জানতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখিয়েছেন। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্দর ও ড্রাই ডকে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব বিনিয়োগ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলবে বলেও জানান তিনি।
ফোরাম চলাকালে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি গোলটেবিল আলোচনারও আয়োজন করে সংস্থাটি।
উপস্থাপিত প্রকল্পের বড় অংশ জ্বালানি খাতের। দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট মেটাতে সরকারকে আমদানি করা এলএনজির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। গত শনিবারও সরকারি ক্রয় কমিটি স্পট মার্কেট ও কাতার থেকে ছয় কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাবে সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশের মতো আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। ফোরামের প্রথম দিন রোববার এক মন্ত্রিপর্যায়ের প্যানেলে আশিক চৌধুরী সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগকারী চিহ্নিত করা, জমি প্রস্তুত, নীতিগত সমন্বয় এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) কাঠামো তৈরির কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অব্যবহৃত সরকারি জমিতে সোনাগাজী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মডেল অন্য এলাকায় প্রয়োগের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের পাইপলাইনে এখন ১৫টি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। আগামী কয়েক মাসে পিপিপির মাধ্যমে এগুলো এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। তবে প্রকল্পগুলোর মোট বিনিয়োগ, উৎপাদনক্ষমতা কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা জানানো হয়নি।




