বোর্নমাউথের কাছে ৩-০ হারে ৪০ বছরের মধ্যে লিগে সবচেয়ে বাজে শুরু: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সংকটের পাঁচ কারণ
ঘরের মাঠে বোর্নমাউথের কাছে ৩-০ গোলে হেরে নতুন নিচে নেমেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। এই হারে ৪০ বছরের মধ্যে লিগ মৌসুমে ক্লাবটির সবচেয়ে বাজে শুরু আরও দীর্ঘ হলো। রোববারের ম্যাচের পর শুধু ম্যানেজারের ভবিষ্যৎ নয়, মালিকপক্ষ, ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা ও পুরো খেলোয়াড় দল নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
ইউনাইটেডের সমর্থকেরা সাধারণত ম্যানেজার বা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে যান না। রোববার সেই চিত্র বদলে যায় — মাইকেল ক্যারিককে তারা অভিবাদন দিয়ে বিদায় দিলেও খেলোয়াড়দের দুয়ো দেন। সমর্থকদের বার্তা পরিষ্কার: প্রথম দলের পুরো কাঠামো ও যারা এই খেলোয়াড়দের এনেছেন, কারও ক্ষেত্রেই তারা আর ধৈর্য ধরতে রাজি নন।
সংকটের প্রথম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নিয়মিত গোলদাতার অভাব। ২০২২ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় দফা শেষে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো চলে যাওয়ার পর থেকে দলটি নির্ভরযোগ্য গোলদাতা পায়নি। রোনালদোর ফেরার আগে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ ছিলেন স্বল্পমেয়াদি সমাধান, আর রোমেলু লুকাকু সুনাম অনুযায়ী গোল দিতে পারেননি। ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হালান্ডের জবাব হিসেবে আনা ড্যানিশ স্ট্রাইকার রাসমুস হইলুন্ড গোলের অভাবে আবার ইতালিতে ফেরত যান।
২০২৫ সালের গ্রীষ্মে বড় অঙ্কে আসা সার্বিয়ার ২৩ বছর বয়সী বেনিয়ামিন শেশকো মাঝে মাঝে ভালো খেললেও চোটে ভুগেছেন, আর এই মৌসুমের বাজে শুরুতে তাঁর অনুপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাথেউস কুনিয়া ও ব্রায়ান এমবেউমোকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো হয়েছে, কিন্তু দুজনই স্বভাবগতভাবে উইঙ্গার। ‘ফলস নাইন’ হিসেবে ব্রুনো ফের্নান্দেসকে খেলাতে গিয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি — রেকর্ড গড়া অ্যাসিস্টের খেলা — কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের গোলদাতা তালিকায় ইউনাইটেডের সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবেউমোর (৪ গোল) ওপরে আছেন আটজন খেলোয়াড়।
দ্বিতীয় বড় কারণ দলবদলের ব্যর্থতা ও মালিকানা। গ্লেজার পরিবার ২০০৫ সালে ইউনাইটেডে যুক্ত হয়, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন অবসর নেন ২০১৩ সালে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফার্গুসন ও তৎকালীন প্রধান নির্বাহী ডেভিড গিলই এতদিন গ্লেজারদের মালিকানার সমস্যাগুলো আড়াল করে রেখেছিলেন। গত ১৩ বছরে ক্লাবটির ৭৫টি সাইনিংয়ের প্রায় সবই ব্যর্থ হয়েছে; ফের্নান্দেসই সম্ভবত একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফার্গুসনের কোনো দলে জায়গা পাওয়ার কাছাকাছি যেতে পারতেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রধান নির্বাহী এড উডওয়ার্ড ব্যর্থ সাইনিং ও একের পর এক বরখাস্ত হওয়া ম্যানেজারের জন্য সমর্থকদের সমালোচনার মুখে ছিলেন।
বর্তমানে খেলোয়াড় কেনার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাহী ওমর বেররাদা ও কারিগরি পরিচালকের জুটিই এখন সমর্থকদের রোষের মুখে, ড্রেসিংরুমেও সেই অসন্তোষ পৌঁছেছে বলে বলা হচ্ছে। আর্জেন্টিনাকে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলতে সাহায্য করা ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে হারের পর বিশেষ করে উইলকক্সকে লক্ষ্য করে গ্রীষ্মে দলে বিনিয়োগের ঘাটতির সমালোচনা করেছিলেন। দুই বছর আগে স্যার জিম র্যাটক্লিফের আইএনইওএস গ্রুপ বড় বিনিয়োগ করলেও মাঠের বাইরের ছাঁটাই বিতর্ক তৈরি করেছে, প্রশিক্ষণ মাঠ ও ওল্ড ট্র্যাফোর্ড পুনর্নির্মাণের বড় পরিকল্পনার ফেরত এখন পর্যন্ত ন্যূনতম।
তৃতীয় প্রশ্নটি ব্রুনো ফের্নান্দেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কোমোর কাছে বুধবারের হারের পর ক্যারিকের কৌশলের প্রকাশ্য সমালোচনা করায় রোববার বোর্নমাউথ ম্যাচে মাঠে না নামলেও তাঁকে দুয়ো দেওয়া হয়। ৩২ বছর বয়সী ফের্নান্দেস ২০২০ সালে আসার পর থেকে ক্লাবটির প্রধান ভরসা; তিনি ছন্দে থাকলে ইউনাইটেডও ছন্দে থাকে। সৌদি প্রো লিগ তাঁকে পেতে বড় অঙ্ক খরচ করতে প্রস্তুত, গ্রীষ্মে গালাতাসারাইও আগ্রহী ছিল বলে জানা গেছে, আর ক্লাব তাঁকে বিক্রির ব্যাপারে খোলামেলা থাকায় ফের্নান্দেস নিজের হতাশা গোপন করেননি।
চতুর্থ কারণ হিসেবে বলা হয়েছে লেফট-ব্যাক না কেনা। আক্রমণে শেশকোর পাশে বিকল্প না আনার পাশাপাশি এই পজিশনে গভীরতার অভাবটাই মার্তিনেসের বিস্ফোরক মন্তব্যের কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের লুইস হলের নাম গ্রীষ্মজুড়ে শোনা গেলেও দলবদলের শেষ দিন পর্যন্ত সেই চুক্তি হয়নি এবং ওই ভূমিকায় অন্য কাউকেও আনা হয়নি।
পঞ্চম কারণ খেলার ধরন নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। ‘আক্রমণ, আক্রমণ, আক্রমণ’ স্লোগানই ছিল ক্লাবটির ভিত্তি — ১৯৫০-এর দশকে ম্যাট বাসবির দল থেকে জর্জ বেস্ট ও ববি চার্লটনের পুনর্গঠিত দল, তারপর ফার্গুসনের দল পর্যন্ত। ফের্নান্দেস চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোমোর বিপক্ষে চাপ না দেওয়ার জন্য ক্যারিকের সমালোচনা করেছেন। এর আগে হোসে মরিনিয়ো খেলোয়াড় বিদ্রোহের মুখে পড়েছিলেন, লুইস ফান হালের পাসিং ‘দর্শন’ নিয়েও ওয়েইন রুনি ও ক্যারিকের নেতৃত্বে খেলোয়াড়েরা অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে বলা হয়, আর রুবেন আমোরিমের ৩-৪-৩ ছক খেলোয়াড়দেরই বেশি বিভ্রান্ত করেছে। রালফ রাংনিক একসময় বলেছিলেন, পুরো ক্লাবের ‘ওপেন-হার্ট সার্জারি’ দরকার। রোববার স্কাই স্পোর্টসে সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল কয়েকজন খেলোয়াড়ের অপেশাদারিত্বের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘তাদের কয়েকজন ততটা পেশাদার নয়।’
