নাইজারে সেনা মোতায়েনে দুই কক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদন আলজেরিয়ার: ১৯৭৩ সালের পর প্রথম বিদেশি মিশনে যাচ্ছে আলজেরীয় বাহিনী

প্রতিবেশী নাইজারে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব আলজেরিয়ার পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই অনুমোদিত হয়েছে। রোববারের এই ভোটের মধ্য দিয়ে ১৯৭৩ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে সামরিক মিশনে যাওয়ার পথ চূড়ান্ত হলো আলজেরীয় বাহিনীর। মোতায়েন করা বাহিনীর দায়িত্ব হবে ‘জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষা’, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সোনাত্রাক পরিচালিত তেল প্রকল্পগুলো।
রোববার পার্লামেন্টের বদ্ধদ্বার জরুরি অধিবেশনে প্রস্তাবটি পাস হয়। উচ্চকক্ষে উপস্থিত ১৪৮ জন আইনপ্রণেতা পক্ষে ভোট দেন; উচ্চকক্ষের মোট সদস্য ১৭৪ জন। নিম্নকক্ষ জানিয়েছে, তারাও ‘নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায়’ নাইজারে সামরিক ইউনিট মোতায়েনের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তবে তারা সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
আলজেরিয়ার সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে যেকোনো সেনা মোতায়েনের জন্য পার্লামেন্টের প্রতিটি কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন। সেই সাংবিধানিক শর্তই এখন পূরণ হলো।
বিদেশে এই মোতায়েন হবে ১৯৭৩ সালের পর আলজেরিয়ার প্রথম। ১৯৭৩ সালে আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় মিসরকে সমর্থন দিতে সেনা পাঠিয়েছিল আলজিয়ার্স। কর্তৃপক্ষ এখনো পাঠানো বাহিনীর আকার বা মিশন শুরুর তারিখ ঘোষণা করেনি, তবে জোর দিয়ে বলেছে, মোতায়েন হবে সীমিত পরিসরে এবং আলজেরীয় বিনিয়োগ সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ।
কয়েক মাস আগে নাইজারে একটি অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার হওয়ার ধারাবাহিকতায় এলো এই সিদ্ধান্ত। সে সময় আলজেরিয়া নিয়ামেকে উপহার হিসেবে চারটি সামরিক হেলিকপ্টার দিয়েছিল।
রোববারের ভোটের আগে গত বুধবার নাইজারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সালিফু মোদি আলজেরিয়া সফর করেন। সফরে তিনি প্রেসিডেন্ট আবদেলমজিদ তেব্বুন এবং সেনাপ্রধান সাঈদ চেনগ্রিহার সঙ্গে বৈঠক করেন। আলজেরীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সফরেই দুই পক্ষ একটি সামরিক সহযোগিতা প্রটোকল সই করে।
এই পদক্ষেপের পথ তৈরি করেছিলেন তেব্বুন নিজেই। ৩ অক্টোবর টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর দেশ নাইজারকে রক্ষা করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘যা-ই হোক না কেন, আমরা নাইজারকে রক্ষা করব,’ এবং অভিযোগ করেন, নাম প্রকাশ না করা কয়েকটি রাষ্ট্র নাইজারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
আগস্টে হেলিকপ্টার দেওয়ার পর একই মাসে অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সময় নাইজার কর্তৃপক্ষকে সমর্থন দিতে আলজেরিয়া চারটি সু-৩০ যুদ্ধবিমান পাঠায়, সঙ্গে ছিল আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী একটি বিমান।
এই সামরিক পদক্ষেপের কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক স্বার্থ। সোনাত্রাক তার আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিপেক্সের মাধ্যমে নাইজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে; সিপেক্স দেশটির উত্তরে কাফরা তেলক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালনা করছে, যা আলজেরিয়া সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরে। ১৩ আগস্ট এলাকাটিতে একটি কূপ খনন শুরু করে কোম্পানিটি। আনাদোলু বার্তা সংস্থার বরাতে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পের তেলসম্পদ আড়াই বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি বলে ধারণা করা হয়, যা আলজেরিয়ার বাইরে সোনাত্রাকের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ।
আলজেরিয়ার স্বার্থ সরাসরি তেল খাতের বাইরেও বিস্তৃত। নাইজার হলো ট্রান্স-সাহারান গ্যাস পাইপলাইনের কৌশলগত করিডোর; ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই পাইপলাইন নাইজেরিয়ার গ্যাস নাইজার ও আলজেরিয়া হয়ে ইউরোপে নিয়ে যাবে। জুনে নিজের ভূখণ্ডে পাইপলাইনের অংশের কাজ শুরু করেছে আলজেরিয়া এবং নিয়ামে ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ৪০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেছে।
তেব্বুন এই সামরিক পদক্ষেপগুলোকে অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি নাইজারের সঙ্গে তেল ও খনি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সই হওয়া চুক্তির কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন, কিছু পক্ষ এসব প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সামরিক সমর্থন শুধু তেল স্থাপনা রক্ষার বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক সংকটে আলজেরিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কয়েক দশক ধরে দেশটি কূটনীতি ও সংলাপের ওপর ভরসা রেখেছে এবং সীমানার বাইরে সামরিক পদক্ষেপের ব্যাপারে সতর্ক থেকেছে।
এর আগে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। গত বছর আলজেরিয়া মালির একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর কূটনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়; সে সময় সামরিক জান্তা-শাসিত মিত্র মালি ও বুরকিনা ফাসোর সঙ্গে নাইজারও আলজিয়ার্স থেকে নিজের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। ৯৬০ কিলোমিটার মরু সীমান্ত ভাগ করা এই দুই প্রতিবেশী এখন জিহাদি সহিংসতা, সীমান্তপারের অপরাধ ও পাচার মোকাবিলাসহ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে নাইজার শাসন করছে জেনারেল আবদুরাহামানে তিয়ানির নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা। তারা নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বাজুমকে ক্ষমতাচ্যুত করে, যিনি তখন থেকেই আটক রয়েছেন। দেশটি এখনো নিরাপত্তা অস্থিরতা ও চলমান সশস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।



