বান্দরবানে ফানুসের রঙে রঙিন পাহাড়ের আকাশ: শুরু মারমাদের প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব
বান্দরবানে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শত শত ফানুস উড়ে রঙিন হয়ে উঠেছে পাহাড়ের আকাশ। মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ‘ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে’ বা প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে এই ফানুস ওড়ানো হয়।
প্রতি বছর দুই দিনব্যাপী আয়োজনে এই উৎসব উদ্যাপন করা হলেও এ বছর তিন দিনব্যাপী প্রবারণা পূর্ণিমার আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার শুরু হওয়া এই আয়োজন শেষ হবে বুধবার সকালে।
কথিত আছে, আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সংসার পরিত্যাগ করেছিলেন রাজকুমার সিদ্ধার্থ, যিনি দীর্ঘ তপস্যায় গৌতম বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি এই পূর্ণিমাতেই নিজের মাথার চুল আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই স্মরণে প্রতি বছর আশ্বিনী পূর্ণিমার তিথিতে আকাশে শত শত ফানুস ওড়ানো হয়।
সোমবার সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ার সময় মারমা ভাষায় ‘সাও দো’, ‘সাও দো’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি চ নু মং মার্মা জানান, সোমবার সন্ধ্যায় পুরাতন রাজবাড়ী প্রাঙ্গণ থেকে বিহারে পূজার উদ্দেশে মঙ্গল রথযাত্রা, সন্ধ্যা ৬টায় মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও চূড়ামণি জাদির উদ্দেশে রংবেরঙের ফানুস ওড়ানো এবং সন্ধ্যা ৭টায় বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় পিঠা তৈরি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তিনি মঙ্গলবারের রথযাত্রা ও সাঙ্গু নদীর উজানীপাড়া খেয়াঘাটে মঙ্গল রথ উৎসর্গের কর্মসূচির কথাও জানান।
মারমা সম্প্রদায় তিন মাস বর্ষাব্রত পালনের পর এই উৎসব পালন করে। উৎসবের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে দলবদ্ধভাবে রাতভর পিঠা তৈরি, নতুন পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি হরেক রকমের পিঠা বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আকাশে ফানুস ওড়ানো ও রথযাত্রা।
সোমবার সকাল থেকে বান্দরবানের বিহারে বিহারে ভিক্ষুদের উদ্দেশে অর্থ ও অন্নদান এবং ফুল পূজা চলছে। উপাসক-উপাসিকারা অষ্টশীল ও দশশীল গ্রহণ করছেন, বিহারে বিহারে চলছে ধর্মীয় দেশনা এবং জগতের সব প্রাণীর মঙ্গল কামনায় করা হচ্ছে বিশেষ প্রার্থনা।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন বিহারে উপস্থিত হয়ে সুখ-শান্তি ও পারিবারিক সুস্থতার জন্য প্রার্থনায় জড়ো হচ্ছেন। দায়ক-দায়িকারা মোমবাতি ও ধূপকাঠি প্রজ্জ্বলন করে এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ছোয়াইং (বিভিন্ন ধরনের খাবার) প্রদান করে দিনটি পালন করছেন।
সোমবার বিকেল ৫টায় ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে তৈরি মঙ্গলরথে বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করা হয়। রথটি ঐতিহ্যবাহী রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারে বন্দনার জন্য নেওয়া হয়, পরে উজানীপাড়া বৌদ্ধ বিহারে বন্দনা শেষে আবার পুরাতন রাজবাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে তৈরি রথে বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করে রথটি পুরো শহর ঘোরানো হবে। এ সময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে বুদ্ধমূর্তিকে শ্রদ্ধা জানাবেন।
প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসবকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম।


