ব্রিটেনে কেয়ারার্স অ্যালাউন্সের ‘ক্লিফ-এজ’ নিয়ম বাতিল হচ্ছে: সাপ্তাহিক আয়ের সীমা ছাড়ালেই পুরো ভাতা হারানোর বিধান শেষ

ব্রিটেনে অবৈতনিক পরিচর্যাকারীদের (কেয়ারার) ভাতার বিতর্কিত ‘ক্লিফ-এজ’ নিয়ম বাতিল করা হচ্ছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর) জন হিলি বুধবারের বাজেটে কেয়ারার্স অ্যালাউন্সের জন্য নতুন ডিজিটাল টেপার পদ্ধতি ঘোষণা করবেন, যার মাধ্যমে সাপ্তাহিক আয়ের সীমা সামান্য ছাড়ালেই পুরো সপ্তাহের ভাতা হারানোর বিধান কার্যত শেষ হয়ে যাবে।
বর্তমান নিয়মে একজন কেয়ারার সাপ্তাহিক আয়ের অনুমোদিত সীমা—বর্তমানে ২০৪ পাউন্ড—এক পেনি বেশি আয় করলেই ওই সপ্তাহের পুরো ভাতা, বর্তমানে ৮৬ দশমিক ৪৫ পাউন্ড, হারান। কেউ এক বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে মাত্র এক পেনি করে বেশি আয় করলে মোট অতিরিক্ত আয় দাঁড়ায় ৫২ পেনি, অথচ তাকে ফেরত দিতে বলা হয় ৪ হাজার ৪৯৫ দশমিক ৪০ পাউন্ড।
গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, শত শত হাজার কেয়ারার নিজেদের কোনো দোষ ছাড়াই সামান্য অঙ্কে সীমা ছাড়িয়ে জীবন বদলে দেওয়ার মতো ঋণের বোঝা বইছেন। কল্যাণ কর্মকর্তারা সেই ঋণ আদায়ে মাদক ব্যবসায়ী ও সংগঠিত অপরাধী দলের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারের জন্য তৈরি আইন ব্যবহার করেছেন; ফলে কোনো কোনো অবৈতনিক কেয়ারার প্রতারণার দায়ে দণ্ডিতও হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কল্যাণ ও পেনশন বিভাগ (ডিডব্লিউপি) কেয়ারাররা সীমা ছাড়ালেই তা জানতে পারত, কিন্তু তাদের সতর্ক করতে অস্বীকার করেছে—বিভাগের বক্তব্য ছিল, পরিবর্তনের তথ্য জানানোর দায়িত্ব কেয়ারারদেরই। অনেকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরজুড়ে লঙ্ঘনের কথা জানতেনই না; ফলে অতিরিক্ত পরিশোধের ঋণ সাধারণত ২ হাজার থেকে ৫ হাজার পাউন্ড, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে।
নতুন নিয়মে টেপার পদ্ধতিতে সীমার বেশি প্রতি অতিরিক্ত ১ পাউন্ড আয়ের বিপরীতে কেয়ারার্স অ্যালাউন্স থেকে মাত্র ১ পাউন্ড কাটা হবে। ফলে অতিরিক্ত শিফটে কাজ করা বা সামান্য বেতন বাড়লেই কেয়ারাররা আগের চেয়ে আর্থিকভাবে খারাপ অবস্থায় পড়বেন না।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের পর সরকারের নিযুক্ত স্বাধীন পর্যালোচনায় প্রতিবন্ধী অধিকার বিশেষজ্ঞ লিজ সেস এই ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরেন; পর্যালোচনাটি গত বছর প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কেয়ারার মোট ৩০ কোটি পাউন্ড অতিরিক্ত পরিশোধের ঋণে পড়েছেন এবং বিপুল সংখ্যক কেয়ারার বিষণ্নতা ও কষ্টের শিকার হয়েছেন।
পর্যালোচনায় উল্লেখিত এক ঘটনায় জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আয়ের সীমার চেয়ে দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় এক কেয়ারার ঘণ্টা না বাড়িয়েই সপ্তাহে ১৫ পেনি সীমার ওপরে চলে যান। কয়েক মাস পর তাকে জানানো হয়, মোট মাত্র ৫ পাউন্ড বেশি আয়ের জন্য তার জরিমানা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার পাউন্ড।
চ্যান্সেলর জন হিলি গার্ডিয়ানকে বলেন, কেয়ারার্স অ্যালাউন্স ব্যবস্থা কেয়ারারদের বিরুদ্ধেই কাজ করেছে। তার ভাষায়, অতিরিক্ত একটি শিফট বা সামান্য বেতনবৃদ্ধি কাউকে আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় ফেলতে পারে না—এটা ঠিক হতে পারে না। বুধবারের বাজেটে ক্লিফ-এজ শেষ করে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাতা ধাপে ধাপে কমানোর (টেপার) ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যাতে কেয়ারাররা হঠাৎ সব সহায়তা হারানোর ভয় ছাড়া একটু বেশি কাজ ও আয় করতে পারেন।
কেয়ারার্স ইউকে এই সিদ্ধান্তকে ‘দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংস্কার’ বলে স্বাগত জানিয়েছে। তবে টেপার চালানোর নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরির কারিগরি চাহিদার কারণে সংস্কারটি দশকের শেষের আগে চালু হবে না—এ নিয়ে হতাশাও প্রকাশ পেয়েছে। সংগঠনটির মতে, সপ্তাহে কমপক্ষে ৩৫ ঘণ্টা পরিচর্যার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করা কেয়ারারদের জন্য ক্লিফ-এজ নিয়ম বিপর্যয় ডেকে আনে; ঝুঁকির কারণে অনেকে চাকরি ছেড়ে দেন কিংবা পদোন্নতি, ওভারটাইম বা বোনাস নিতে অস্বীকার করেন।
কেয়ারার্স সংস্কারটি বাজেটের আগে ঘোষিত পাঁচটি ‘প্রাত্যহিক সংস্কারের’ একটি। এর মধ্যে রয়েছে নিজের গাড়ি কাজে ব্যবহারকারীদের জন্য করমুক্ত মাইলেজ হার স্থায়ী করা—প্রথম ১০ হাজার ব্যবসায়িক মাইলের জন্য মাইলপ্রতি ৫৫ পেনি হার স্থায়ী হচ্ছে এবং ১০ হাজার মাইলের বেশি অংশের হার মাইলপ্রতি ৩৫ পেনিতে বাড়ানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, এতে কর্মচারী ও স্বনিয়োজিত মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। তবে ইরান সংঘাতসহ বৈশ্বিক ঘটনায় সৃষ্ট সংকীর্ণ আর্থিক পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর হাতে সুযোগ সীমিত বলেও মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো সতর্ক করেছে।



