বাতের ব্যথায় ১০ মিটার হাঁটাও কঠিন ছিল, সেই খাজাই করেছেন ১৬ সেঞ্চুরি: ১৭ বছর চেপে রাখা গল্প শোনালেন নিজেই
অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি ব্যাটসম্যান উসমান খাজার পরিসংখ্যান ক্রিকেটপ্রেমীদের চেনা — ৮৮ টেস্ট, ৬ হাজার ২২৯ রান আর ১৬টি সেঞ্চুরি। কিন্তু এর আড়ালে ১৭ বছর ধরে চেপে রাখা এক যন্ত্রণার গল্প এবার নিজেই শুনিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অস্ট্রেলিয়ান স্টোরি’তে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাজা জানিয়েছেন, মাত্র ২২ বছর বয়সে তার শরীরে ধরা পড়ে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস — একধরনের বাত রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নিজেরই সুস্থ টিস্যু, বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে আক্রমণ করে। ফলে তীব্র ব্যথা, ফোলা ও প্রদাহ দেখা দিতে পারে। খাজার ক্ষেত্রে রোগটি আক্রমণ করেছিল বাঁ হাঁটুতে।
ব্যথা এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে একসময় ১০ মিটার হাঁটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেই সময়ের কথা মনে করে খাজা বলেছেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, মারা যাব।’
সময়টা ২০০৯ সাল। নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে খেলছিলেন খাজা, তখন মৌসুমের বিরতি চলছিল। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এই তরুণ ব্যাটসম্যানের জীবনে ঠিক তখনই নেমে আসে এই বিপর্যয়।
রোগের কথা চিকিৎসকেরা জানতেন, ক্রিকেট প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও জানতেন। কিন্তু সতীর্থদের কাউকে বলেননি খাজা। তার ভয় ছিল, অসুস্থতার কথা জানাজানি হলে তাকে অন্য চোখে দেখা হবে, কেউ হয়তো বিশেষ সুবিধা দিতে চাইবেন, আবার প্রতিপক্ষ তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। এমনকি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাবেক সতীর্থ ডেভিড ওয়ার্নার ও মাইকেল হাসিও জানতেন না তার অসুস্থতার কথা।
লড়াইটা শুধু মনের জোরে জেতা সম্ভব ছিল না। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়েছে, নিতে হয়েছে ইনজেকশন। চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন তিনি; রোগ ধরা পড়ার প্রায় ছয় মাস পর আবার ক্রিকেট মাঠে ফিরতে পেরেছিলেন। খাজার কথায়, ‘ওই ওষুধ না থাকলে আমি আর কোনো দিন ক্রিকেট খেলতে পারতাম না। এমনকি স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারতাম না।’
এরপর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় খাজার। তবে জাতীয় দলে ঢুকলেই সব সমস্যার সমাধান হয়নি — তাকে বারবার দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে, আবার ফিরেও এসেছেন। ব্যর্থতা ও সমালোচনা এলেও হাল ছাড়েননি তিনি।
খাজার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ২০২১-২২ মৌসুমের অ্যাশেজ। সিডনি টেস্টে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। সেই সিডনিতেই ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজের পঞ্চম টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন খাজা।
অবসরের পর সেই গোপন অধ্যায়ের দরজা খুলেছেন তিনি। সামনে আসছে তার আত্মজীবনী ‘সবর’ — আরবি এই শব্দের অর্থ ধৈর্য। সেখানে নিজের জীবন ও ক্রিকেট ক্যারিয়ারের আরও অনেক অজানা গল্প তুলে ধরবেন তিনি।
নিজের অসুস্থতার কথা প্রকাশ করে এখন অন্যদের, বিশেষ করে অটোইমিউন রোগে ভোগা মানুষদের সাহস দিতে চান সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার। খাজা বলেছেন, ‘রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নিয়েও যদি কেউ পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে পারে, তাহলে আমার মনে হয়, আরও অনেক মানুষও অনেক কিছু অর্জন করতে পারবে।’



