নদীপথে অপরাধের চিত্র: সাড়ে পাঁচ বছরে উদ্ধার ২ হাজার ৪৯৪ মরদেহ, এক বছরে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি
দেশের নদীপথে হত্যা, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নদীপথকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ে করা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অপরাধীরা হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের আলামত মুছে ফেলার কৌশল হিসেবে নদীপথকে বেছে নিচ্ছে।
নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর ৯ মাসে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি বিভিন্নভাবে নদীতে পড়ে দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু এবং নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ৭৩৯ জনের মরদেহ শনাক্ত হয়েছে; পরিচয় শনাক্ত হয়নি ৭৫৫ জনের।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, বাস্তব অপরাধের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে ও গ্রেপ্তার এড়াতে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয় অপরাধীরা; অনেক ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ মুছে যাওয়া ও চেহারা বিকৃত হওয়ার কারণে পরিচয় শনাক্ত করা যায় না।
মামলার পরিসংখ্যানেও অপরাধ বাড়ার চিত্র স্পষ্ট। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নদীপথকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে ২ হাজার ৮৫টি মামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৯টি—এক বছরেই মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি।
নদীপথে যেসব অপরাধ বাড়ছে তার মধ্যে রয়েছে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধ বালু উত্তোলন। মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের গুলিতে জেলে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে; চাঁদা না দেওয়ায় নৌশ্রমিকদের ওপর হামলা হচ্ছে এবং পণ্যবাহী নৌযান থেকে মালামাল লুট হচ্ছে।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে নৌ পুলিশের সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী, বিশেষ করে নৌ ডাকাত ও জলদস্যুরা পুলিশের ওপর আক্রমণ করতেও পিছপা হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে বর্ষা মৌসুমে নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার। বিশাল এই নৌপথে নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি দিয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা সহজ নয়।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর দুর্গম চরাঞ্চল ও জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথে নিরাপত্তার ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে, আর অপরাধীরা সেই সুযোগই নিচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, নদীপথে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যাও তত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অপরাধপ্রবণ নদীপথ, চরাঞ্চল এবং মরদেহ ফেলার সম্ভাব্য স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং নৌ পুলিশের জনবল, আধুনিক নৌযান, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, জেলা ও মহানগর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত যৌথ অভিযানের প্রয়োজনীয়তাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।


