ডলোমাইটে গলতে থাকা হিমবাহ থেকে বেরিয়ে এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ২৫০টি বিস্ফোরক

ইতালির ডলোমাইট পর্বতমালায় দ্রুত পিছু হটতে থাকা হিমবাহ থেকে এ গ্রীষ্মে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় বিস্ফোরক ভান্ডার বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে ইতালির সেনাবাহিনী। বরফের ভেতরে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা এসব যন্ত্র সেনাবাহিনীর জুলিয়া আলপাইন ব্রিগেড সরিয়ে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করেছে।
ব্রিগেডের বিবৃতি অনুযায়ী, উদ্ধার করা বিস্ফোরকের মধ্যে ছিল ১৮টি ইতালীয় ৭৫ মিলিমিটার কামানের গোলা এবং ৩৭টি থেভেতো মর্টার গোলা। থেভেতো ছিল ফরাসি তৈরি যন্ত্র, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির রাজকীয় সেনাবাহিনীকেও সরবরাহ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ২৫০টি বিস্ফোরক উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
এসব অস্ত্রের উৎস ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা ‘হোয়াইট ওয়ার’ বা শ্বেত যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনী ও ইতালীয় সৈন্যরা দুর্গম ও প্রচণ্ড ঠান্ডা ভূখণ্ডে মুখোমুখি হয়েছিল।
এক শতাব্দীর বেশি সময় পর এ গ্রীষ্মে পর্বতারোহীরা বেশ কয়েক জায়গায় বোমা দেখতে পেয়ে খবর দেন। তাদের বেশিরভাগ খবর এসেছিল পূর্ব ত্রেনতিনোর প্রিমিয়েরো উপত্যকার কানাল সান বোভো এলাকা থেকে। এরপর সৈন্যরা সেখানে এবং ত্রেনতিনো আলতো আদিজে অঞ্চলের ডলোমাইটের অন্যান্য উচ্চ ও হিমবাহ এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালান।
এটি প্রথমবার নয় যে গলতে থাকা হিমবাহ থেকে শ্বেত যুদ্ধের নিদর্শন বেরিয়ে এসেছে। হিমবাহের পিছু হটা এক দশকের বেশি সময় ধরে ত্বরান্বিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বার্গামো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং স্তেলভিও জাতীয় উদ্যানের ঐতিহ্য প্রকল্পের সমন্বয়কারী স্তেফানো মোরোসিনি বলেন, ‘এটি অনেকটাই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতি।’ স্তেলভিও জাতীয় উদ্যান এলাকাতেও কিছু বিস্ফোরক পাওয়া গেছে।
মোরোসিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিটি গ্রীষ্মের শেষে এসব বিপজ্জনক নিদর্শন বেরিয়ে আসে এবং প্রতি বছর সংখ্যা বাড়ে। এগুলো ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বরফে সংরক্ষিত ছিল। কিছু ইতিমধ্যে বিস্ফোরিত হয়েছিল, কিন্তু অনেকগুলো হয়নি, তাই এখন যখন সেগুলো আবার বেরিয়ে আসে, তখন সেগুলো খুব, খুব বিপজ্জনক।’
পর্বতারোহীদের জন্য পরামর্শ হলো, যেখানেই পাওয়া যাক না কেন, কোনো ধরনের বিস্ফোরক যন্ত্র কখনো স্পর্শ না করা এবং দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া।
শ্বেত যুদ্ধ মূলত ত্রেনতিনো আলতো-আদিজের ডলোমাইট এবং লোম্বার্ডি অঞ্চলের আল্পসে সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত এই ইতিহাস যেন জমে ছিল; এরপর বৈশ্বিক উষ্ণায়নে অস্ত্র, স্লেজ, চিঠি ও ডায়েরিসহ নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত নানা জিনিস বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
স্তেলভিও গিরিপথের দিকে মুখ করা ৩ হাজার ৯৫ মিটার (১০ হাজার ১৫৪ ফুট) উঁচু মাউন্ট স্কোরলুজ্জোর চূড়ায় গুহার ভেতরে খোঁড়া একটি কাঠের ব্যারাক ২০১৫ সালে আবার দেখা যায়, প্রায় এক শতাব্দী ধরে সেটিকে আটকে রাখা বরফ পুরোপুরি গলে যাওয়ার পর। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধ শেষ হলে সৈন্যরা তাড়াহুড়ো করে ব্যারাকটি তালাবদ্ধ করে বেশিরভাগ জিনিস ফেলে গিয়েছিলেন; ভেতরে খড়ের বিছানা, পোশাক, লণ্ঠন, সংবাদপত্র, পোস্টকার্ড, মুদ্রা ও টিনজাত খাবার ভালোভাবে সংরক্ষিত পাওয়া যায়।
এসব নিদর্শন রাখার জন্য বোরমিওতে একটি শ্বেত যুদ্ধ জাদুঘর ২০২৭ সালের জুনে খোলার কথা রয়েছে। শ্বেত যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও বেশিরভাগ সৈন্য তুষারধস, পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়া বা হাইপোথার্মিয়ায় মারা গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। গত ১৫ বছরে গলতে থাকা বরফ থেকে ইউনিফর্মসহ কয়েক ডজন মরদেহও বেরিয়ে এসেছে। প্রেসেনা হিমবাহে পরিচয় জানানোর নথিসহ মরদেহ পাওয়ার পর ২০১৭ সালে এক ইতালীয় সৈন্যের স্বজনরা তাকে কবর দিতে পেরেছিলেন।
মোরোসিনি বলেন, প্রচণ্ড গ্রীষ্মের তাপে ডলোমাইটের হিমবাহে যাওয়া ক্রমেই কম নিরাপদ হয়ে উঠছে। ২০২২ সালে মারমোলাদা হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে ১১ জন মারা যান। তিনি বলেন, ‘উচ্চতায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহের কারণে গ্রীষ্মে হিমবাহে যাওয়া ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এলাকায় এলে দেখা যায় হিমবাহ কত দ্রুত পিছু হটছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কত শক্তিশালী।’



