…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › ইউরোপ › খবর
ইউরোপ

ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ থামছে না: শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় ব্যয় বাড়ানোর দাবিতে এক দিনে রাস্তায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভ সপ্তাহান্তেও থামেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দেওয়া এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার দাবিতে তরুণরা দেশজুড়ে রাস্তায় নেমেছেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার।

এই বিক্ষোভের সূত্রপাত গত মাসে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। স্কুলে অতিরিক্ত ভিড় — অনেক শ্রেণিকক্ষে ৩২ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী — অনুপস্থিত শিক্ষকের বিকল্প না পাওয়া এবং জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা প্রথমে ক্যাম্পাসে অবরোধ শুরু করে। সেখান থেকে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভকারীদের হাতে দেখা গেছে ‘আমাদের সহ্য করার নয়, গড়ে তোলার ভবিষ্যৎ আছে’ লেখা প্ল্যাকার্ড। সরকারি সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কমে যাওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন তারা।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষকরাও। তাদের অভিযোগ, বেতন কম। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডির ‘এডুকেশন অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে একজন স্কুলশিক্ষকের বার্ষিক মোট বেতন ৪১ হাজার ৯৬৮ ইউরো (প্রায় ৪৬ হাজার ৯০০ ডলার), যেখানে জার্মানিতে একই পদের বেতন ৬৯ হাজার ৪৫৩ ইউরো (প্রায় ৭৭ হাজার ৭০০ ডলার)। সামাজিক কর, বেশি পেনশন অবদান আর জীবনযাত্রার ব্যয়ে মাসের আয় আরও কমে যায় বলে শিক্ষকদের অভিযোগ।

স্কুলের সম্পদ নিয়ে শুরু হওয়া স্থানীয় ধর্মঘট এখন ট্রেড ইউনিয়ন ও সরকারি কর্মচারীদেরও টেনে এনেছে, আর বিক্ষোভটি রূপ নিয়েছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে। এর পেছনে রয়েছে সরকারের প্রস্তাবিত ৫ হাজার ৪০০ কোটি ইউরোর (৬ হাজার কোটি ডলার) ব্যয়-সংকোচন ও কর প্যাকেজ, যা ২০২৭ সালের বাজেটের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে এবং যাতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্থগিত রাখার কথাও রয়েছে।

শিক্ষার্থী ও তরুণদের আশঙ্কা, কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো দারিদ্র্যের হার আর বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সরকারি ব্যয় কমানোর ধাক্কাটা তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়বে।

লে মেডিয়া টিভির সাংবাদিক ও ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের সাবেক সংসদীয় সহকারী আমিন স্নুসি আল জাজিরাকে বলেন, সরকারি অর্থ অন্যত্র খরচ হওয়ায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা শোচনীয়। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ঠান্ডা, নোংরা ভবনে পড়ছে, কোনো কোনো ভবনে ইঁদুরের উপদ্রব আছে। কোনো কোনো স্কুলে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে অনুপস্থিত শিক্ষকের বদলি আসেনি। আর এসব ঘটছে যখন হাজার হাজার শিক্ষকের পদ কাটা হচ্ছে, আর সরকারি অর্থ বেসরকারি স্কুলগুলোর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এভাবেই স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে।’

বিক্ষোভের জবাবে সরকার কারফিউ জারি করেছে এবং বিক্ষোভকারীদের দমনে সারা দেশে পুলিশ মোতায়েন করেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ অতি-বাম গোষ্ঠীগুলোকে ‘প্রজাতন্ত্র ধ্বংসের’ চেষ্টার জন্য দায়ী করেছেন এবং সহিংসতায় জড়িতদের জবাবদিহির হুমকি দিয়েছেন।

শুক্রবার বিক্ষোভ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট মাখোঁ। তবে সেই বৈঠক উত্তেজনা কমাতে পারেনি; ছাত্র প্রতিনিধিরা সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না পাওয়া পর্যন্ত আরও আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।

সোমবার মার্সেই সফরে গিয়ে মাখোঁ বলেন, তিনি সরকারকে এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূলে থাকা যৌক্তিক দাবিগুলো মেটাতে বলেছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, জাতীয় অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্ল্যাটফর্ম পারকুরস্যুপে পরিবর্তন আনার ঘোষণাও আসতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র আর্থিক সংকট আর পরিকল্পিত বাজেট-কাটছাঁটের কারণেই ছাত্রদের দাবি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার; এর ফলে দেশের শিক্ষা বাজেটও কমেছে। ফরাসি অর্থনীতিবিদ ও ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের সহপরিচালক লুকা শঁসেলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীপ্রতি হিসেবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে দেখলে উচ্চশিক্ষা, ছাত্রজীবন ও গবেষণায় সরকারি বাজেট ২০১৭ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।

সরকার অবশ্য ব্যয়-সংকোচনের পক্ষেই যুক্তি দিচ্ছে। ৭ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ ল্যকর্ন্যু স্বীকার করেন, ‘তরুণদের ক্ষোভ হঠাৎ করে আসেনি’ এবং অক্টোবরের শেষ নাগাদ এই সংকট মোকাবিলায় সরকার পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের ব্যয় যাচাই করতেও বলেছেন, কারণ ফ্রান্সের জাতীয় ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউরো (৪ ট্রিলিয়ন ডলার), যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ শতাংশের সমান।

তবে বাজারের কাছে মোট ঋণের চেয়ে বড় উদ্বেগ ক্রমবর্ধমান ঘাটতি, যা ২০২৬ সালে জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে — ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় মাত্র ৩ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থনীতিবিদ তমা পিকেতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, সরকারি ঋণ বাড়লেও দেশের বেসরকারি সম্পদ জিডিপির ৩০০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০০ শতাংশে পৌঁছেছে, যার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত সবচেয়ে ধনী আর্থিক সম্পদশালীদের হাতে। তিনি বলেন, ‘অন্য কথায়, ফ্রান্স কখনোই এত ধনী ছিল না। সমাধান করতে হবে শুধু বণ্টনের সমস্যাটি।’ ফরাসি অর্থনৈতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওএফসিইর ২০২৬ সালের জানুয়ারির এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীরা জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হলেও দেশের সম্পদের ৬০ শতাংশের মালিক তারাই।

ইউরোপ বিভাগের আরও খবর

ডলোমাইটে গলতে থাকা হিমবাহ থেকে বেরিয়ে এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ২৫০টি বিস্ফোরক
ইউরোপ

ডলোমাইটে গলতে থাকা হিমবাহ থেকে বেরিয়ে এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ২৫০টি বিস্ফোরক

ইতালির ডলোমাইট পর্বতমালায় দ্রুত পিছু হটতে থাকা হিমবাহ থেকে এ গ্রীষ্মে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় বিস্ফোরক ভান্ডার বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে ইতালির…

নির্বাচনে জয়ের পরদিন বেলগ্রেডে ‘চাচিল্যান্ড’ পরিষ্কারে নামলেন স্টুডেন্ট লিস্টের সমর্থকেরা
ইউরোপ

নির্বাচনে জয়ের পরদিন বেলগ্রেডে ‘চাচিল্যান্ড’ পরিষ্কারে নামলেন স্টুডেন্ট লিস্টের সমর্থকেরা

সার্বিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে স্টুডেন্ট লিস্টের জয়ের পরদিন সকালে আন্দোলনের সমর্থকেরা আবর্জনার ব্যাগ হাতে বেলগ্রেডের পাইওনিয়ার্স পার্কে জড়ো হন। জাতীয…

ইউরোপ

ব্রাসেলসে তামাক লবির দৌড়ঝাঁপ চার গুণ: ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে ৪০০-র বেশি বৈঠক

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তামাক ও নিকোটিনসংক্রান্ত আইনগুলো নতুন করে সাজানোর প্রস্তুতি নেওয়ার এই সময়ে ব্রাসেলসে তামাকশিল্পের লবিং তীব্রভাবে বেড়েছে। বর্তমান ই…

ফ্রান্সে জরিপ: সব প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে প্রত্যাখ্যাত, সবচেয়ে কম প্রত্যাখ্যান লো পেনের
ইউরোপ

ফ্রান্সে জরিপ: সব প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে প্রত্যাখ্যাত, সবচেয়ে কম প্রত্যাখ্যান লো পেনের

ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীদের নিয়ে করা নতুন জরিপে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা সব প্রার্থীকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ফরাসি ভোটার প্রত্যাখ্যান করছেন। তব…