ইরানে মৃত্যুদণ্ডের মুখে আরও অন্তত ছয় ক্রীড়াবিদ: পর্বতারোহী মোস্তাফাভির ফাঁসির পর বাড়ছে উদ্বেগ

ইরানে মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা আরও ক্রীড়াবিদদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পর্বতারোহী আলি-সিনা মোস্তাফাভি সম্প্রতি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সর্বশেষ ক্রীড়াবিদ। মানবাধিকার গোষ্ঠী হিউম্যান রাইটস ফর স্পোর্ট জানিয়েছে, গত এক মাসে দুজন ক্রীড়াবিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে এবং অন্তত আরও ছয়জন একই পরিণতির মুখে আছেন।
মোস্তাফাভি বিশ্বের কয়েকটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গে, মাউন্ট এভারেস্টসহ, আরোহণের ছবি ও বিবরণ প্রকাশ করতেন। কয়েক মাস আগের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর এপ্রিলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। অক্টোবরের শুরুতে তায়কোয়ান্দো ক্রীড়াবিদ সিয়াভাশ জামশিদি খেইরাবাদিকে হত্যা করা হয়, আর মে মাসে ফাঁসি দেওয়া হয় মিশ্র মার্শাল আর্ট যোদ্ধা গোলামরেজা খানি শাকারাবকে।
হিউম্যান রাইটস ফর স্পোর্ট হলো অসলোভিত্তিক সাবেক ইরানি ক্রীড়াবিদদের একটি গোষ্ঠী, যারা ক্রমবর্ধমান এসব ঘটনার নথি সংরক্ষণ করছে। গোষ্ঠীটি সতর্ক করেছে, ইরানের সুপ্রিম কোর্টে সাজা বহাল থাকায় অন্তত আরও ছয় ক্রীড়াবিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিতে থাকাদের মধ্যে রয়েছেন সাঁতারু আলি পিশেভারজাদেহ এবং ফুটবলার এহসান হোসেইনপুর; জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় দুজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। রয়েছেন বক্সার মোহাম্মদ জাভাদ ভাফায়ি সানিও; এক বছর আগের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং গত বছর তাঁর পুনর্বিচারের আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
এ ছাড়া মিশ্র মার্শাল আর্ট যোদ্ধা বেনিয়ামিন নাঘদি, অশ্বারোহী ক্রীড়াবিদ তারানেহ রহিমি এবং পর্বতারোহী মরিয়ম সিরিকেও এই বছর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে গোষ্ঠীটি জানিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ফর স্পোর্ট বলেছে, জানুয়ারির বিক্ষোভ বা তার আগের রাজনৈতিক অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত মামলায় ইতিমধ্যে ছয়জন ক্রীড়াবিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
গোষ্ঠীটির ড. জোহরেহ আবদুল্লাহখানি বলেন, ইরানের ক্রীড়া সমাজ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজনের ক্ষেত্রে অন্য সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মনোযোগ ও সচেতনতা তৈরি করে তাঁরা মৃত্যুদণ্ড থামাতে পেরেছিলেন, তবে তা ছিল সাময়িক; তিনি সবার জন্যই খুব উদ্বিগ্ন।
গোষ্ঠীটির বিশ্বাস, বৃহত্তর সমাজকে বার্তা দিতেই ক্রীড়াবিদদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে; বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদদের মৃত্যুর খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। কুস্তিগির নাভিদ আফকারি সাঙ্গারির কথা উল্লেখ করে আবদুল্লাহখানি বলেন, তিনি ছিলেন পুরো সমাজের কাছে একজন রোল মডেল ও বিখ্যাত মানুষ; তাঁর ঘটনা ছিল পুরো জনগণের জন্য সতর্কবার্তা। আফকারিকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ফাঁসি দেওয়া হয়।
মোস্তাফাভির সাজা সেপ্টেম্বরের শেষে সুপ্রিম কোর্টে বহাল থাকে। কেরমানে আটক থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর শারীরিক সহিংসতা চালানো হয়েছিল বলে মনে করা হয়; পরে তাঁকে নির্জন কারাকক্ষে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ‘আমেরিকান-জায়নিস্ট শত্রুর সশস্ত্র এজেন্ট’ হওয়ার অভিযোগ আনা হয়; ২৪ মার্চ কেরমানের আজাদি স্কয়ারে বেসামরিকদের ওপর গুলি চালানো এবং জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগও ছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগে তাঁর পরিবারকে কারাগারে ডেকে পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
আবদুল্লাহখানি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন, কারণ তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও নিরাপত্তা বাহিনী লক্ষ্যবস্তু করছে। এক ঘটনায় একজনের বোন ও ভগ্নিপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুরো পরিবারের ফোন লাইনে নজরদারি চলছে; ফলে সরাসরি যোগাযোগ করা একেবারেই অসম্ভব।
হিউম্যান রাইটস ফর স্পোর্টের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সরাসরি গুলিতে ২১৭ জন ইরানি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন এবং আরও ১০০ জনের বেশি আটক হয়েছেন। বিশ্বকাপের আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের চার সদস্য মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা ইরানি ক্রীড়াবিদদের বিষয়ে ফিফাকে চিঠিও লিখেছিলেন।



