টোকিও যৌথ বিবৃতি: পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ ও দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানালেন তাকাইচি

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এই বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়।
গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
দুই নেতা এই উপলক্ষে ঘোষিত বড় ধরনের বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানান। তাঁরা টেকসই সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে একমত হন।
দুই দেশের প্রধান দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগটিকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’তে উন্নীত করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ, সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায়ও উদ্যোগটির পরিধি বাড়বে।
এই উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও আইসিটি অবকাঠামোর উন্নয়ন একযোগে এগিয়ে নেওয়া, শিল্প মূল্য শৃঙ্খলের একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য ও সরবরাহের একটি প্রবেশদ্বার তৈরির বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন।
উদ্যোগটির চারটি অগ্রাধিকার হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
এই কাঠামোর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে একটি বৃহৎ লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।
আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে একমত হয়েছেন। তাঁরা ঢাকায় এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার কথাও বলেছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান।
উৎপাদন, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে পরিপূরক ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুই নেতা একমত হন।
তাকাইচি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। জবাবে তারেক রহমান সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন। তিনি উন্নত নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার অঙ্গীকার করেন। এই অঙ্গীকার করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ এবং লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরকে দুই নেতা স্বাগত জানান। এ ছাড়া জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরকেও তাঁরা স্বাগত জানান।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা। দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকারও তাঁরা পুনর্ব্যক্ত করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পের বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা।
তাকাইচি বলেন, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের অনুরোধ নিয়ে আরও আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে জাপান। দুই নেতা অবাধ, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় এটিই জাপানের প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প।
দ্বিপক্ষীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল রূপান্তর, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা। মানবসম্পদের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখতেও তাঁরা একমত হন।
স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ-২)’ প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে দুই নেতা স্বাগত জানান।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যকর হওয়াকে দুই নেতা স্বাগত জানান। জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) কর্মসূচির আওতায় একটি টহল জাহাজ এবং সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহল নৌযান দেওয়ার বিষয়টিকেও তাঁরা স্বাগত জানান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের প্রশংসা করেন। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।




