বহুজাতিক কোম্পানির বৈশ্বিক করের অর্থে পরের বাজেট মেটানোর ভাবনা ইউরোপীয় কমিশনের
ইউরোপীয় কমিশন খতিয়ে দেখছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর বৈশ্বিক কর চুক্তি থেকে পাওয়া রাজস্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরের সাত বছরের বাজেটে অর্থ জোগাতে ব্যবহার করা যায় কি না। এ বিষয়ে অবগত চারজন ইইউ কূটনীতিকের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা জাতীয় রাজধানীগুলোকে নতুন ইইউ-ব্যাপী করারোপে সম্মত হতে চাপ দিচ্ছেন, যাতে ব্লকের বাজেটে জাতীয় অবদান কমানো যায়। এই মাসের শুরুর দিকে আসা সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী বাজেটের আকার ১.৮২ ট্রিলিয়ন ইউরো।
কস্তা বাজেট আলোচনায় মধ্যস্থতা করছেন এবং বছরের শেষের আগেই নেতাদের মধ্যে বাজেট চুক্তিতে পৌঁছাতে চাপ দিচ্ছেন — পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালির নির্বাচন আলোচনাকে ভেস্তে দেওয়ার আগেই।
এক বছরের বেশি সময় ধরে দর-কষাকষির পরও ইইউ সরকারগুলো প্রস্তাবিত পাঁচটি নতুন কর নিয়ে মতভেদে রয়েছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী এসব কর থেকে বছরে ৬৫ বিলিয়ন ইউরো আসতে পারে। এসব কর ইইউর নিজস্ব সম্পদ হিসেবে পরিচিত।
বিকল্পগুলোর মধ্যে কোর (CORE) নামে একটি কর্পোরেট কর সবচেয়ে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই কর ১০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি রাজস্ব থাকা কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর এককালীন অর্থ ধার্য করে। জার্মানিতে এটি বিশেষভাবে অপছন্দের।
দুজন কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে নেতাদের সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বহুজাতিক কোম্পানির করের একটি অংশ ইইউ বাজেটে দেওয়ার পক্ষে সমর্থন দেন। সমর্থকদের যুক্তি, এই ভাবনা কোরের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সমর্থন পেতে পারে, কারণ এটি কোম্পানির রাজস্বের বদলে মুনাফার ওপর কর ধার্য করে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সাবেক কর্মকর্তা এবং বৈশ্বিক কর ব্যবস্থার অন্যতম স্থপতি পাসকাল সাঁত-আমঁস বলেন, কর্পোরেট আয়কর কোম্পানির মুনাফার ভিত্তিতে কর নেয়। কোর তা নয়; কোর অন্ধভাবে একটি অর্থ আদায় করে।
২০২১ সালের ওইসিডি কর চুক্তি অনুযায়ী, বার্ষিক লেনদেন ৭৫০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি এমন বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর ১৫ শতাংশ সর্বনিম্ন কর্পোরেট কর ধার্য করতে ইইউ দেশগুলো বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্র এই নিয়ম থেকে ছাড় পেয়েছে, কারণ তার জাতীয় কর ব্যবস্থাকে ওইসিডি কাঠামোর সমতুল্য বলে গণ্য করা হয়েছে। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো বড় বহুজাতিক কোম্পানি টানতে দেশগুলোর মধ্যে কম হারে কর দেওয়ার প্রতিযোগিতা ঠেকানো।
ঐতিহাসিকভাবে অ্যাপল ও গুগলের মতো অনেক বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি ইইউজুড়ে কাজ করলেও কম কর ও হালকা নিয়ন্ত্রণের কারণে আয়ারল্যান্ডে সদর দপ্তর করেছে। এই প্রবণতা মোকাবিলায় ওইসিডি চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ শতাংশের কম হার ধার্য করা দেশগুলোকে বড় বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর ‘টপ-আপ কর’ বসাতে হয়। বর্তমানে এই রাজস্ব জাতীয় সরকারগুলো সংগ্রহ করে। তবে কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের রাজধানীগুলো এই অর্থের একটি অংশ ব্লকের বাজেটে দিতে পারে।
এতে আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মতো কম কর্পোরেট কর ধার্য করে টপ-আপ কর থেকে বড় অঙ্ক সংগ্রহ করা দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ডাচ সরকার ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সর্বনিম্ন কর-সংক্রান্ত রিটার্ন থেকে ৪৪৯ মিলিয়ন ইউরো সংগ্রহ করেছে।
সাঁত-আমঁস এই সম্ভাব্য নতুন নিজস্ব সম্পদের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম আয়ারল্যান্ডে হলেও তা ইইউর বাজার পরিচালনা নিয়েই। তাঁর ভাষ্য, এভাবেই টপ-আপ করকে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত হতে পারে।
কস্তার দল ও কমিশন আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হতে যাওয়া ইইউ দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আগে এই বিকল্পটি খতিয়ে দেখছে। ২৬ ও ২৭ নভেম্বরের নেতাদের সম্মেলনের আগে নতুন বাজেটের অঙ্ক ও ইইউ কর প্রস্তাব করার আগেই কস্তা সরকারগুলোর মনোভাব যাচাই করবেন।


