লন্ডনে ব্যালন ডি’অর জিতলেন হ্যারি কেইন, শেষ হলো ইংল্যান্ডের ২৫ বছরের অপেক্ষা
এক সময় ট্রফি না জেতা সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবলার বলে ঠাট্টার শিকার হওয়া হ্যারি কেইন এখন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি’অর নিজের করে নিয়েছেন। লন্ডন প্যালাডিয়ামে সোমবারের অনুষ্ঠানে ট্রফিতে আলতো করে চুমু দিয়ে তিনি সেটি আকাশে তুলে ধরেন, মুখে ছিল অবিশ্বাসের ছাপ।
অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে শত শত ইংল্যান্ড সমর্থক এই মুহূর্তের জন্য লাইন ধরেছিলেন, আর সারা দেশে লাখো মানুষ অপেক্ষা করেছিলেন। উপস্থিত দর্শকদের তুমুল করতালির মধ্যে কেইন নিজের গৌরবের মুহূর্ত উপভোগ করেন। এই অর্জনকে বলা হচ্ছে ২৫ বছর ধরে তৈরি হওয়া এক দিন।
৩৩ বছর বয়সে, যখন তাঁর অনেক সমসাময়িক সেরা সময় পেরিয়ে গেছেন, কেইন ঠিক সময়ে নিজের সেরা ছন্দে পৌঁছেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তিনি কখনোই তারকা হিসেবে শুরু করেননি; বছরের পর বছর খেলার সুযোগের জন্য লড়তে হয়েছে, এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে ধারে যেতে হয়েছে।
ডিএজেডএনকে কেইন বলেন, ‘অনেকেই ভাবেননি, হয়তো আমিও ভাবিনি যে আমি এত দূর আসব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে অনেক ওঠানামার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে। আমি কখনো সেই মানুষ ছিলাম না, যাকে লোকে আজকের কিছু তারকার মতো সুপারস্টার ভাবত।’
কেইন বলেন, তাঁকে সময় নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে; অনেক সময় লড়াইটা ছিল নিজের মনের সঙ্গেই। আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা দেখাতে হয়েছে তাঁকে, এবং সেটাই তাঁকে ভিত্তি দিয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেও উন্নতি চালিয়ে যেতে।
কষ্ট তাঁর ক্যারিয়ারে লেগেই ছিল শুরু থেকে। আট বছর বয়সে তিনি আর্সেনাল একাডেমিতে যোগ দেন, কিন্তু তা টেকেনি বেশিদিন। তখনকার একাডেমি পরিচালক লিয়াম ব্র্যাডি তাঁকে ‘একটু মোটা’ ও ‘খুব একটা অ্যাথলেটিক নয়’ বলে মাত্র এক মৌসুম পর ছেড়ে দেন।
১৩ বছর বয়সে কেইন টটেনহ্যাম হটস্পারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে যোগ দেন। একাডেমি পরিচালক জন ম্যাকডারমট তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন দলের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা খেলোয়াড় হিসেবে। ২০১৬ সালে গোলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ম্যাকডারমট বলেছিলেন, ‘সে দ্রুত ছিল না। সে ছিল সবার পেছনে — বাকি দলের চেয়ে ৩০ শতাংশ পিছিয়ে!’
সিনিয়র ফুটবলে সুযোগ পেতেও টটেনহ্যামকে রাজি করাতে সময় লেগেছিল। ২০০৯ সালের পর কেইন ইংলিশ ফুটবলের বিভিন্ন স্তরে ধারে খেলেন — লেটন ওরিয়েন্ট, মিলওয়াল, লেস্টার সিটি ও নরউইচ সিটিতে। ২০১১ সালে শ্যামরক রোভার্সের বিপক্ষে প্রথম স্পার্স গোলের পর পরের গোলটি আসে ২০১৩ সালে হল সিটির বিপক্ষে, প্রায় দুই বছর পর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে উত্থানের পরও তাঁকে ‘এক মৌসুমের বিস্ময়’ বলা হয়েছিল।
উত্তর লন্ডনের ক্লাবটিতে ১৪টি সিনিয়র মৌসুমে কেইন গড়েন একের পর এক রেকর্ড — তিনটি প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট, ছয়বার পিএফএ প্রিমিয়ার লিগ বর্ষসেরা দলে জায়গা এবং সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৩০টির বেশি ম্যাচে ক্লাব-রেকর্ড ২৮০ গোল।
তবে এত ব্যক্তিগত উজ্জ্বলতা সত্ত্বেও বড় ট্রফি ছাড়াই স্পার্স ছাড়েন কেইন। ২০১৯ সালে লিভারপুলের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে হারা দলে তিনি ছিলেন, আর ইংল্যান্ডের হয়ে দুবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে হেরেছেন।
প্রথম ট্রফির জন্য কেইনকে অপেক্ষা করতে হয় ৩১ বছর বয়স পর্যন্ত — বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ২০২৪-২৫ বুন্ডেসলিগা শিরোপা। এরপর তিনি আরও চারটি ক্লাব ট্রফি জিতেছেন, যার মধ্যে আছে আরেকটি জার্মান শীর্ষ লিগ শিরোপা ও জার্মান কাপ।
গোল করার রেকর্ডে কেইন ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা ৯১ গোলে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোল করা ইংরেজ খেলোয়াড় ৫৮ গোলে এবং প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ২১৩ গোলে। গত মাসে তিনি বুন্ডেসলিগায় দ্রুততম ১০০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছেন — বায়ার্নের হয়ে ৯৮তম লিগ ম্যাচে।
গত মৌসুমে ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে তাঁর ৭৩ গোল ছিল ২০১১-১২ মৌসুমে লিওনেল মেসির ৮২ গোলের পর কোনো ফুটবলারের সর্বোচ্চ। ইউইএফএ ডটকমকে কেইন বলেছেন, তাঁর পাস দেওয়ার পরিসর, দৃষ্টি ও খেলা বোঝার ক্ষমতা সারা ক্যারিয়ারজুড়েই ছিল এবং গত কয়েক বছরে তা আরও বিকশিত হয়েছে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের মতো কিশোর বয়সে বিশ্বকাপ জেতা তারকাদের মতো কেইনের মহত্ব নির্ধারিত ছিল না, এবং পুরস্কার অনুষ্ঠানের আগে তাঁরা শিরোনাম দখল করলেও কেইন বড় প্রচারণা ছাড়াই নিজের ফুটবল দিয়েই কথা বলেছেন। সোমবারের জয়ে ইংল্যান্ডের ব্যালন ডি’অর জয়ের ২৫ বছরের অপেক্ষা শেষ হয়েছে।



