ওলেশকি ছাড়িয়ে পুরো খেরসন অঞ্চলে ছড়াল যুদ্ধবিরতি, শুক্রবার সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের রুশ-অধিকৃত শহর ওলেশকিতে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি এখন বৃহত্তর খেরসন অঞ্চলজুড়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে শুরু হওয়া এই বিরতির কোনো লঙ্ঘনের খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ওলেশকিতে কয়েক হাজার বাসিন্দা খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎ ছাড়া আটকা পড়ে আছেন; শহরের এক পাশে নিপ্রো নদী, অন্য পাশে রুশ বাহিনী, আর বের হওয়ার সব সড়কই অত্যন্ত বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, যিনি পোপ লিওর সঙ্গে মিলে এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছেন, মঙ্গলবার বলেন, মানবিক কনভয়গুলোর জন্য ‘নিরাপদ যাতায়াত’ নিশ্চিত করতে যুদ্ধবিরতির এলাকা ওলেশকির বাইরে খেরসন অঞ্চলের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়েছে। তিনি এ কথা এক্সে জানান।
ইউক্রেনের পাবলিক ওম্বাডসম্যানের প্রেস সচিব বিষয়টি সমর্থন করেছেন। খেরসনের উপপ্রধান ওলেকসান্দর তোলোকোনিকভ জানান, ইউক্রেনের হাতে থাকা খেরসন শহর এবং বৃহত্তর অঞ্চল—দুই জায়গাতেই রুশ গোলাবর্ষণ বন্ধ রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে এবং তারপর শুক্রবার যাঁরা শহর ছাড়তে চান, তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ওলেশকিতে এখনো আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার মানুষ রয়েছেন এবং আশপাশের এলাকায় আরও কয়েক হাজার মানুষ আছেন।
যুদ্ধের আগে ওলেশকির জনসংখ্যা ছিল ২৪ হাজার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের প্রথম দিনগুলোতেই শহরটি রুশ বাহিনীর দখলে যায়। শহরে কোনো দোকান খোলা নেই এবং ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ উড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি নেই; ওই বন্যায় ওলেশকিতেই অনেকে মারা যান।
বাসিন্দাদের অনেকে বাগানের আগাছা রান্না করে খেয়ে বেঁচে থাকছেন। তাঁরা বিবিসিকে বলেছেন, তাঁরা চরম ক্ষুধায় ভুগছেন এবং শহর ছাড়তে চান। শহর থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে মাইন পোঁতা রয়েছে এবং সেগুলো ড্রোন হামলার মুখে পড়ে, ফলে সরবরাহ ভেতরে নেওয়া যেমন কঠিন, পালিয়ে যাওয়াও তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ।
এক নারী বিবিসিকে জানান, তিনি একটি ল্যান্ডমাইনে পা দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে আছেন, যেখানে তাঁর দুটি অস্ত্রোপচার হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না আমাকে সেখানে কত দিন থাকতে হবে,’ এবং সরিয়ে নেওয়ার দলে যোগ দিতে পারা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতি মেনে চলা হচ্ছে বলে জানিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, সবকিছু ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী’ এগোচ্ছে, এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা, বিশেষ করে মেলানিয়া ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, যুদ্ধবিরতি ফল দিলে তা শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যান্য পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সংসদীয় দলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাভিদ আরাখামিয়া বলেন, যুদ্ধবিরতি রোববার ১ নভেম্বর ইউক্রেনীয় সময় রাত ১০টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত চলবে এবং তিনি এটিকে ‘২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় উত্তেজনা-হ্রাস’ বলে বর্ণনা করেন।
পোপ লিও এই মাসের শুরুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ওলেশকিতে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার আবেদন জানান এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। এরপর গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস জানায়, মেলানিয়া ট্রাম্প একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সরবরাহ পৌঁছানোর সুযোগ করে দিতে সড়কগুলো থেকে মাইন সরানোর কথা রয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর নিপ্রো গ্রুপের ইউনিটগুলো গ্রামটিতে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোতে ‘প্রকৌশলগত অনুসন্ধান’ চালিয়ে বিস্ফোরক ও ফাঁদ-যন্ত্র সরাচ্ছে। স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী বিবিসিকে জানান, মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে প্রায় ৫০০ মানুষ শহর ছাড়ার আগ্রহ জানিয়েছেন।
খেরসনের রুশ-নিযুক্ত প্রধান ভ্লাদিমির সালদো জানান, অঞ্চলটির ভেতরে, রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিমিয়ায় এবং রুশ সীমান্তের ওপারে রোস্তভ, ক্রাসনোদার ও স্তাভরোপোল অঞ্চলে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি রুশ গণমাধ্যমকে বলেন, ওলেশকির অধিকাংশ বাসিন্দা শহর ছেড়ে রাশিয়ায় থাকতে চান; তবে মাঠপর্যায়ে তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থন মেলেনি।
জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া মাইন সরিয়ে যেসব পথ খুলবে, সেগুলো দিয়ে শহর ছাড়া বেসামরিকেরা ‘রাশিয়ার দিকে যাবেন এবং সেখানেই থেকে যাবেন’। তিনি বলেন, কিছু বাসিন্দা ‘একভাবে বা অন্যভাবে’ ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পৌঁছাবেন, এবং আটকে পড়া প্রত্যেকের নিজের গন্তব্যে পৌঁছানো ও ইউক্রেনে সরিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
কিছু বাসিন্দা ও তাঁদের স্বজনেরা বিবিসিকে বলেছেন, তাঁদের ভয়—রাশিয়া হয়তো তাঁদের ইউক্রেনে ফিরতে দেবে না, কিংবা ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের লক্ষণ খুঁজতে তাঁদের ফোন ও অনলাইন কার্যকলাপ পরীক্ষা করবে। শহরটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নপ্রায় এবং রুশদের প্রতিশোধের ভয়ে অনেকে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে রাজি নন।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে মাইনক্ষেত্র পেরিয়ে ওলেশকি থেকে পালিয়ে আসা সেরহি নামের এক বাসিন্দা রাশিয়া ও বেলারুশ হয়ে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে ফিরে আসেন। তিনি নিপ্রো নদী পেরিয়ে এমন একটি পথের দাবি জানান, যা রুশ-অধিকৃত এলাকা এড়িয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘রুশ ফেডারেশনকে আপনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেন না।’ নদীর ওপরের সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং নদীর তীরেও মাইন পোঁতা ও বিপজ্জনক; সূত্রগুলোর মতে, নদী পেরিয়ে ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যাওয়া সম্ভব নয়।
নদীর অপর পাড়ে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসন শহরে মঙ্গলবার ভোর তিনটা থেকে কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়নি এবং ড্রোন-সংক্রান্ত আহতের কোনো খবরও আসেনি বলে স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে; গাড়ি ও পথচারীরা অবাধে চলাচল করছেন। শহরের বাসিন্দা গালিনা কিরিচেঙ্কো সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সুসপিলনেকে বলেন, ‘বাইরে হাঁটা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিচারে পরিবেশটা কিছুটা শান্ত লাগছে।’ ইউক্রেনের সামরিক জেনারেল স্টাফ লোকজনকে মানবিক কনভয় ও মানুষের যাতায়াতের পথ, সময় ও স্থান নিয়ে অযাচাইকৃত প্রতিবেদন বিশ্বাস না করতে এবং গুজব না ছড়াতে আহ্বান জানিয়েছে।




