কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে ৩০ ঘণ্টা পরও জ্বলছে নলকূপের গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৩০ ঘণ্টা পরও জ্বলছে। অবিরাম গ্যাস নির্গত হওয়ায় আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোটখাল সেতুর কাছে মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য মাটি খনন করা হচ্ছিল। এ সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। গর্ত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হওয়ার পরপরই সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। আরেকটি বর্ণনায় ঘটনাস্থলকে ছোট ইনানী এলাকার একটি বসতবাড়ির আঙিনা বলা হয়েছে, যেখানে পাইপ বসানোর সময় সকাল ৮টার দিকে উচ্চ চাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে।
খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর একটি দলও দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালিয়েছে। তবে ভূগর্ভ থেকে গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।
আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ৩৩ কেভি উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে এবং উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সাময়িকভাবে এই সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। অন্য একটি বর্ণনায় চারপাশে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিটার এলাকাজুড়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারির কথা বলা হয়েছে।
গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুনের সূত্রপাতের কারণ অনুসন্ধানে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে কাজ শুরু করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দলের। মঙ্গলবার রাতেই দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেছে; বাপেক্সের প্রতিনিধি দল মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এসএম নাফিফুন আরহাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল খননযন্ত্র। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি বলেন, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
আগুনের শিখার রং ও ধোঁয়ার ধরন দেখে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একই কারণে সেখানে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, সে বিষয়েও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। প্রশাসনের বর্ণনায় বাপেক্সের দল ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠিয়েছে।
নাফিফুন আরহাম বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে, এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি আরও জানান, ভূগর্ভের যে স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে, সেই স্তরের গ্যাস নিঃশেষ হয়ে গেলে আগুন স্বাভাবিকভাবেই নিভে যেতে পারে; এর আগে জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে ভূগর্ভে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আগুন পুরোপুরি নিভে না যাওয়া পর্যন্ত চারপাশের প্রায় ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে এবং ওই এলাকায় বসতি ও জনসমাগম রাখা যাবে না বলেও তিনি জানান।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরে বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের হোটেলকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউর রহমান বলেন, কয়েক দিন আগেই ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে আবার ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলায় তারা খুবই আতঙ্কিত।
কলেজ শিক্ষার্থী মিনু আরা বলেন, ইনানী এলাকায় এভাবে ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তারা ভয়ের মধ্যে আছেন। এসব ঘটনায় তাদের দৈনন্দিন চলাফেরা ও কলেজে যাওয়াও বন্ধ হচ্ছে বলে তিনি জানান।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।




