হিমালয় সীমান্তে চীনা সেনাদের নতুন অবস্থান: ভারত-চীন সম্পর্কে ফের অবনতির শঙ্কা
গত বছরের বেশির ভাগ সময় ধরে সতর্কভাবে স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোনো ভারত ও চীনের সম্পর্কে ফের অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর দিকে চীনের সেনারা হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্ত এলাকার কয়েকটি স্থানে বিপুল সংখ্যায় ফিরে এসেছেন এবং ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করেছেন।
ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বাহিনীর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর রাজস্থান রাজ্যে কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি স্থানে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনা এখনো চলছে।
কাপুর বলেন, জুলাইয়ে এই মুখোমুখি অবস্থান শুরু হয়। প্রথম দিকে উভয় পক্ষই সেখান থেকে সেনা সরিয়ে নেয়। কিন্তু কয়েক দিন পর চীনা সেনারা আরও বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) সম্পর্কে ভারতের ধারণা অনুযায়ী ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে।
এলএসি একটি অস্পষ্ট সীমারেখা, যা দুই প্রতিবেশী দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলোকে আলাদা করেছে। ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার বা প্রায় ২ হাজার ১০০ মাইল দীর্ঘ এই বিতর্কিত সীমান্ত নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে।
চীন অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে। দিল্লি বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে; ভারতের বক্তব্য, অরুণাচল প্রদেশ দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কাপুরের এই বক্তব্য দিল্লিতে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য সচরাচর শোনা যায় না। সংবেদনশীল সীমান্ত সমস্যাগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তুলে ধরে।
এই সীমান্ত বিরোধ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতার পর ভারতের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যাগুলোর একটি এবং দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম। এর জেরে ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী সীমান্তযুদ্ধ হয়, যাতে ভারত শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়ে। ছয় দশকের বেশি সময় পরও সীমান্তের বড় অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত হয়নি।
অঞ্চলটির দুর্গম ভূপ্রকৃতি সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, হ্রদ ও বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গের কারণে সুস্পষ্ট সীমান্ত নির্ধারণ কঠিন, ফলে দুই দেশের সেনারা প্রায়ই মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসেন; কখনো এসব ঘটনা সহিংস সংঘর্ষ ও কূটনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দেয়।
সর্বশেষ বড় উত্তেজনা দেখা দেয় ২০২০ সালের জুনে, লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন। ১৯৭৫ সালের পর সেটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। ভারতের বিরোধী দলগুলো তখন অভিযোগ করে সরকার চীনের কাছে ভূখণ্ড হারিয়েছে, তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বারবার সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওই সংঘর্ষের পর কূটনৈতিক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২৪ সালে দুই দেশ সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপে সম্মত হয়। এরপর তারা সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু করা ও ভিসার বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফর করেন, যা ছিল সাত বছরের মধ্যে তার প্রথম ভারত সফর।
কাপুরের বক্তব্যের পর ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস আবার অভিযোগ করেছে, মোদি সরকার বেইজিংয়ের কাছে ছাড় দিচ্ছে। কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই গুরুতর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার পুরো প্রশাসন নীরব রয়েছে। চীনা সেনারা ভারতীয় ভূখণ্ড বলে বিবেচিত এলাকার ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করেছিল—কাপুরের এই বক্তব্য ভারত সরকার স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে বলেন, চীনা বাহিনী যখন প্রতিষ্ঠিত টহল দেওয়ার নিয়ম থেকে সরে আসে, তখন সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বিঘ্নিত হয়। তিনি বলেন, দুই দেশই অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ ব্যবহার করছে।



