সরকারি ঋণের চাপে মুদ্রানীতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ব্যাংকিং সম্মেলনে বললেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো ও প্রবৃদ্ধির গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে নীতিগত সমন্বয় জরুরি বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
বুধবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মিলনায়তনে ‘১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে এসব কথা ওঠে আসে। দুই দিনের এই সম্মেলনে ব্যাংকিং খাতের সংকট, সংস্কারের চ্যালেঞ্জ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোর নীতিগত দিকগুলো গুরুত্ব পায়।
মূল প্রবন্ধে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ নেওয়ায় মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নীতিগুলোর মধ্যে অধীনতামূলক সম্পর্কের বদলে সমন্বয় নিশ্চিত করার কথাও তিনি বলেন।
জায়েদী সাত্তারের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি, প্রবৃদ্ধিতে সহায়তায় রাজস্ব নীতি এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নমনীয় বিনিময় হার নীতি অনুসরণ করা উচিত। ২০২২ সালের মে মাস থেকে টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের প্রভাব মোকাবিলায় শুল্ক হ্রাস বা ‘কমপেনসেটেড ডেপ্রিসিয়েশন’ গ্রহণের সুপারিশ করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৮০-এর দশকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণকাঠামো তৈরি না করেই বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ২০১০ সালের পর ব্যাংক খাতে ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে আরও ভয়াবহ ‘লুটপাটের সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শুধু কঠোর আইন দিয়ে ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়; ব্যাংকার ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ন্যূনতম নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থাকতে হবে। আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সুবিধা বিতরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা, দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারে কিছু বিধিনিষেধ শিথিলের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা রাখা এবং সৎ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে অর্থ পৌঁছানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারে ওঠায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা ফেরাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৫টি ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং এই কার্যক্রম চলবে।
কবির আহমেদ জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনাদায়ি ঋণের হার ছিল ৩৬ শতাংশ; চলতি বছরের শেষ নাগাদ তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর আশা করা হচ্ছে। এ জন্য বিশেষ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন ও মানি অ্যাক্ট প্রণয়নের কাজ চলছে এবং ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও কারখানা সম্প্রসারণে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং পিএমআই ৪৮-এ নেমে আসা অর্থনৈতিক সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়।
মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নীতি সুদহার অর্থনীতিতে সংকোচনমূলক নীতির প্রভাব ফেলছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। বাজারে গতি ফেরাতে সরকারি মেগা প্রকল্পগুলো চালুর আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ অর্থায়ন আসে বেসরকারি ব্যাংক থেকে। সংস্কারের নীতি এমন হতে হবে, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা অর্থায়ন পান এবং ব্যাংকের পরিচালন সক্ষমতা বজায় থাকে।
সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানপ্রধান জিন পেসমে ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এযাজুল ইসলাম এবং স্বাগত বক্তব্য দেন কনফারেন্স অর্গানাইজিং কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি।




