ডেঙ্গু সন্দেহ হলে ব্যথানাশক খাওয়া কেন বিপজ্জনক: প্লাটিলেট কমে যাওয়ার সময় যে ঝুঁকি বাড়ে

ডেঙ্গু জ্বরে শরীরের প্রতিটি জোড়ায় তীব্র ব্যথা হয়—যেন হাড় ভেঙে যাচ্ছে; মাথা ভারী থাকে, চোখের পেছনে টনটনানি আর পেশিতে অসহ্য যন্ত্রণা থাকে। এ কারণেই ডেঙ্গুকে একসময় ‘ব্রেকবোন ফিভার’ বা হাড়ভাঙা জ্বর বলা হতো। এমন যন্ত্রণায় হাতের কাছে থাকা ব্যথানাশক বড়ি খেতে ইচ্ছে করলেও ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজের ইচ্ছায় তা খাওয়া বিপজ্জনক।
আইবুপ্রোফেন, নাপ্রোক্সেন, ডাইক্লোফেনাক ও অ্যাসপিরিনের মতো ওষুধ ডেঙ্গুর সময় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা না করে, সন্দেহ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে।
এর কারণ বুঝতে হলে জানতে হবে ডেঙ্গু শরীরের ভেতরে কী করে। ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণে রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এই ক্ষুদ্র উপাদানই কোথাও কেটে গেলে বা রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত জড়ো হয়ে রক্তপাত বন্ধ করতে সাহায্য করে।
শরীরে প্রবেশের পর ডেঙ্গু ভাইরাস সরাসরি হাড়ের মজ্জায় আক্রমণ চালায়—আর এই মজ্জাতেই তৈরি হয় অণুচক্রিকা। শুধু তা-ই নয়, ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে শরীরের নিজের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাও ভুলবশত সুস্থ অণুচক্রিকাগুলো ধ্বংস করে ফেলে। ফলে রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমতে থাকে; চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া।
বিপদ শুধু সংখ্যা কমায় সীমাবদ্ধ নয়। ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায়ে রক্তনালির ভেতরের আবরণ ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে রক্তের তরল অংশ বা প্লাজমা নালির বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে এবং রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অর্থাৎ ডেঙ্গুর সময় রক্তপাত বন্ধ করার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতাও বিঘ্নিত হতে পারে।
এই অবস্থায় ব্যথানাশক খেলে আরেকটি সমস্যা শুরু হয়। শরীরে প্রদাহ বা ক্ষত তৈরি হলে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সক্রিয় হয়; অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড থেকে COX-1 ও COX-2 নামের দুটি এনজাইমের সাহায্যে এসব রাসায়নিক তৈরি হয়। এর মধ্যে COX-1-এর সাহায্যে তৈরি থ্রম্বোক্সেন এ২ অণুচক্রিকাকে সক্রিয় করে তাদের একসঙ্গে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে—এটি অনেকটা রাসায়নিক আঠার মতো কাজ করে। আবার প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের কিছু ধরন পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণকে সুরক্ষা দেয়, শ্লেষ্মা বা মিউকাস এবং বাইকার্বোনেট তৈরিতে ভূমিকা রেখে অ্যাসিডের ক্ষতি থেকে দেয়ালকে বাঁচায়।
ব্যথানাশক ওষুধ রক্তে মিশে এই দুই এনজাইমকে অচল করে দেয়। ফলে ব্যথার অনুভূতি সাময়িকভাবে কমলেও অণুচক্রিকার স্বাভাবিক কাজে বাধা পড়ে এবং থ্রম্বোক্সেন ও প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ডেঙ্গুর সময় শরীরের রক্তপাত বন্ধ করার ব্যবস্থা এমনিতেই চাপে থাকে—এখানেই বিপদের শুরু।
সব ওষুধের প্রভাব এক রকম নয়। অ্যাসপিরিন অণুচক্রিকায় COX-1-এর কাজ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ করে দেয়, ফলে থ্রম্বোক্সেন এ২ কমে যায় এবং অণুচক্রিকার জড়ো হওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়। আইবুপ্রোফেনের মতো কিছু ওষুধের প্রভাব তুলনামূলক সাময়িক, তবে ডেঙ্গুর সময় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকায় এসব ওষুধ এড়িয়ে চলার পরামর্শই দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন কমে যাওয়ায় পাকস্থলীর সুরক্ষামূলক মিউকাসের চাদর পাতলা হয়ে যায়। তখন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড সরাসরি পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে আঘাত করে রক্তক্ষরণকারী আলসার বা ক্ষত তৈরি করতে পারে। একদিকে দেয়ালের ক্ষত, অন্যদিকে জমাট বাঁধতে না পারা প্লাটিলেট—এই সমন্বয়ে অনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। রক্তবমি, কালো পায়খানা কিংবা নাক ও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া তাই অবহেলার লক্ষণ নয়; এগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
বিষয়টি পাকস্থলীর রক্তক্ষরণেই থামে না। রক্তনালি থেকে রক্তরস বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ যুক্ত হলে রোগীর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে নেমে যেতে পারে। রক্তসঞ্চালনের অভাবে মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভার ও ফুসফুসের মতো অঙ্গ অক্সিজেনহীন হয়ে কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। এই প্রাণঘাতী অবস্থাকে বলা হয় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম—একটি ব্যথানাশক বড়ির ভুল রোগীকে আইসিইউ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
ডেঙ্গুতে জ্বর ও ব্যথা কমাতে সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিনের তুলনায় প্যারাসিটামল অণুচক্রিকার কাজে অনেক কম প্রভাব ফেলে এবং সাধারণ মাত্রায় পাকস্থলীর সুরক্ষাব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে না, তাই এটি তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প।
তবে প্যারাসিটামলও ইচ্ছেমতো খাওয়া যাবে না। অতিরিক্ত মাত্রায় এটি লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, আর ডেঙ্গুতে লিভার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণে শারীরিক অবস্থা, লিভারের স্বাস্থ্য ও অন্য ওষুধ গ্রহণের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধটি খাওয়া জরুরি।
ওষুধের পাশাপাশি দরকার পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ। পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপসহ উপযুক্ত তরল পান করা যেতে পারে, তবে জোর করে অতিরিক্ত তরল পান করা ঠিক নয়; বয়স, শারীরিক অবস্থা ও রোগের পর্যায় অনুযায়ী তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করা দরকার। চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত পর্যবেক্ষণও জরুরি।
জ্বর কমে গেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না। ডেঙ্গুতে অনেক সময় জ্বর কমার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় গুরুতর জটিলতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি, কালো পায়খানা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, উপযুক্ত তরল গ্রহণ আর বিপদের লক্ষণ চিনতে পারা।




