আমাজনের গহীনে লেজার প্রযুক্তিতে মিলল প্রাচীন সভ্যতার ৪৩২টি ভূ-লিপি, বাস ছিল লাখ লাখ মানুষের

ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের গভীরে লুকিয়ে থাকা শত শত মাটির কাঠামো আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা। তাঁদের ধারণা, এগুলো তৈরি করেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের এক প্রাচীন সভ্যতা।
ঘন জঙ্গলে মাটির নিচে খনন করা এই বিশাল কাঠামোগুলো জিওগ্লিফ নামে পরিচিত। হাজার হাজার বছর আগে প্রধান নদীগুলো থেকে অনেক দূরের এলাকায় এগুলো নির্মিত হয়েছিল।
‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন স্পেন, ফিনল্যান্ড, ব্রাজিল ও ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী।
গবেষকরা লাইডার (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘন জঙ্গলের উপরিভাগ স্ক্যান করেছেন। এই প্রযুক্তি লেজার পালস ব্যবহার করে দূরত্ব মাপে এবং জটিল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে। ফলে গাছপালা না কেটে বা প্রতিটি স্থানে সশরীরে না গিয়েই বিশাল এলাকা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।
হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষণাপত্রের সহ-লেখক মার্টি পার্সিনেন বলেন, ‘আমাজনে এটিই ছিল প্রথম সত্যিকারের উচ্চাভিলাষী লাইডার জরিপ।’
গবেষক দলটি চার হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে জরিপ চালিয়েছে। তারা ৪৩২টি ভূ-লিপি শনাক্ত করেছে, যেগুলোর অধিকাংশই আগে কখনো নথিভুক্ত করা হয়নি। এগুলো নির্মিত হয়েছিল ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
গবেষকদের অনুমান, এগুলো নির্মাণকারী তথাকথিত অ্যাকুইরি সভ্যতা প্রায় এক লাখ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল — আয়তনে যা মোটামুটি কম্বোডিয়া বা সিরিয়ার সমান।
১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দে সভ্যতাটির সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির সময়ে এখানে প্রায় ৩০ লাখ বাসিন্দা থেকে থাকতে পারে বলেও গবেষকরা ধারণা করছেন।
আমাজন জিওগ্লিফস ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও গবেষক দলের সদস্য জীবাশ্মবিজ্ঞানী আলসেউ রানজি বলেন, ‘গ্রিসে যখন পিথাগোরাস তাঁর উপপাদ্যটি বিকশিত করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই এই লোকেরা আমাজনে বিশাল জ্যামিতিক শিল্পকর্ম তৈরি করছিল।’
রানজি জানান, দলটি ১৫ মিটার পর্যন্ত চওড়া এবং পাঁচ মিটার গভীর নালা খুঁজে পেয়েছে। এই ধরনের বিশাল কাঠামো বড় বড় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি ধারণা করেন, এই অঞ্চলে কোনো পাথর নেই, তাই মাটি বহন করার জন্য সম্ভবত কাঠের সরঞ্জাম ও ঝুড়ি ব্যবহার করা হতো। তবে আমাজনের আর্দ্র জলবায়ুর কারণে জৈব পদার্থ দ্রুত পচে যায়, ফলে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন।
গবেষকদের মতে, বিপুলসংখ্যক কর্মী ও শ্রম বিভাজনের পাশাপাশি এই নির্মাণকাজগুলোর জন্য গণিত ও জ্যামিতি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল।
আগে ধারণা করা হতো, আমাজনীয় জনগোষ্ঠী প্রধানত বড় নদীগুলোর তীরে বাস করত, যেখানে খাদ্য সম্পদ সহজে পাওয়া যেত। কিন্তু ভূ-লিপিগুলো প্রধানত নদীগুলোর মধ্যবর্তী উঁচু এলাকাতেই অবস্থিত। নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, এসব অঞ্চলে এমন বিপুলসংখ্যক মানুষও বাস করত, যারা বন পরিবর্তন করতে এবং ফসল চাষ করতে সক্ষম ছিল।
রানজি বলেন, ‘এই লোকেরা কেবল মাছের প্রাচুর্য ও ডিঙি নৌকায় ভ্রমণের সুবিধার জন্য প্রধান নদীগুলোর তীরেই বসবাস করত না। তারা ভূপ্রকৃতি বুঝত, নদী থেকে দূরে বসতি স্থাপন করত এবং এই পথ ধরে পায়ে হেঁটে চলাচল করত।’ তাঁর মতে, এতে আমাজন কীভাবে দখল করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়।
এই গবেষণাসহ সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দীর্ঘদিনের সেই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করছে যে আমাজন বনাঞ্চল ছিল মানব বসতিহীন এক অরণ্য। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয়দের আগমনের অনেক আগে থেকেই লাখ লাখ মানুষ এখানে বাস করত এবং বিশ্বের বৃহত্তম ক্রান্তীয় অরণ্যের গঠন ও বিন্যাসে তারা স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
গবেষণায় যুক্ত গবেষক লোপেসের যুক্তি, ‘আমরা আমাজনে যা দেখি তা কোনো বিশাল প্রাকৃতিক অরণ্য নয়, বরং মানুষের কর্মকাণ্ড দ্বারা গঠিত এক বিশাল ঐতিহাসিক উদ্যান।’
এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক-পূর্ব জনসংখ্যার অনুমান ক্রমেই বেড়েছে। আগের গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, সমগ্র আমাজন এক থেকে আড়াই মিলিয়ন (১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ) মানুষকে ধারণ করতে পারত; পরবর্তী অনুমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ লাখ থেকে এক কোটির মধ্যে। এখন তুলনামূলক ছোট একটি এলাকাই ৩০ লাখ পর্যন্ত বাসিন্দাকে ধারণ করতে পারত বলে ধারণা মেলায় সেই সংখ্যাগুলো আবার ঊর্ধ্বমুখী করে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
গবেষকদের মতে, নবম শতাব্দীতে আমাজনেও হয়তো কোনো বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের সময় এসেছিল। ইউকাতানের পিরামিডগুলো যেমন বনের গ্রাসে চলে গিয়েছিল, আমাজনেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।



