…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › অর্থনীতি ও ব্যবসা › খবর
অর্থনীতি ও ব্যবসা

৭৭৬ টাকার সরকারি এলপিজি যায় কোথায়: বরাদ্দে অনিয়ম, কালোবাজারির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
৭৭৬ টাকার সরকারি এলপিজি যায় কোথায়: বরাদ্দে অনিয়ম, কালোবাজারির অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে বেসরকারি এলপি গ্যাসের সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য সরকার যেখানে ১ হাজার ৯১৩ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেখানে সরকারের নিজের কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডের একই পণ্যের নির্ধারিত দাম মাত্র ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা। অথচ এই সুলভ মূল্যের সরকারি এলপি গ্যাস সব সময় সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে।

বাস্তবে সম্প্রতি ঢাকায় বেসরকারি এলপি গ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে একই পণ্যের দামে এই বিশাল পার্থক্যের কারণে চুরি ও কালোবাজারিসহ নানা ধরনের অপরাধের জন্ম হচ্ছে। আর সরকারি কম দামের সুফল পাচ্ছে সমাজের সীমিত একটি অংশ। সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা গ্যাসের পরিমাণও বেশ কম।

সরকারি পাইপলাইনের গ্যাসের অভাব এবং নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে চলায় দেশে বছর বছর বোতলজাত জ্বালানি এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে এলপিজির মাসিক চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টনে ওঠানামা করে। সেই হিসাবে দৈনিক চাহিদা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টনের মধ্যে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের বার্ষিক সক্ষমতা মাত্র ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টন। অর্থাৎ সরকারি এলপিজি দিয়ে বার্ষিক চাহিদার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ, বা সারা দেশের তিন থেকে পাঁচ দিনের চাহিদা পূরণ করা যায়।

সরকারি এলপিজির বড় একটি অংশ বিভিন্ন সরকারি বাহিনীকে সরবরাহ করা হয়। বাকি অংশ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার তালিকাভুক্ত ডিলারদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। পদ্মা অয়েল কোম্পানির বিপণন বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বাহিনীর বাইরের সিলিন্ডারগুলো রেশনিংয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ডিলারদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। একজন ডিলার সর্বনিম্ন ৫টি থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০টি পর্যন্ত সিলিন্ডার পেয়ে থাকেন।

গত ৫ আগস্টের বিতরণ তথ্য তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ওই দিন ডিলারদের কাছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৯০০, কক্সবাজার অঞ্চলে ১ হাজার ৫০০, ফেনী অঞ্চলে ৮০০, কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৫০ এবং নোয়াখালী অঞ্চলে ৩৪০টি সিলিন্ডার বিতরণ করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে ডিলারদের মাধ্যমে সাড়ে ১২ কেজির ৪০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রি করে কোম্পানিটি।

রাষ্ট্রীয় বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার সিলিন্ডার বিতরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ডিলারদের মধ্যে বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই। অগ্রাধিকার নির্ধারণেও নেই কোনো নীতিমালা। যেমন গত ৫ আগস্ট সিলেটের একজন ডিলার এক দিনে ১ হাজার ৪০০টি সিলিন্ডার পেয়েছিলেন। একই দিন সেখানকার অন্য ডিলারদের মধ্যে কেউ মাত্র ১০টি, আবার কেউ ১৫টি করে পেয়েছেন। ডিলারভেদে বরাদ্দের এমন পার্থক্যের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি পদ্মা অয়েলের বিপণন বিভাগের কর্মকর্তারা।

একই দিন খুলনা অঞ্চলের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫০০ সিলিন্ডার। সেখানকার তালিকাভুক্ত ডিলাররা সর্বনিম্ন ৫টি থেকে সর্বোচ্চ ২৫টি করে সিলিন্ডার পেয়েছেন।

বাজারে সুলভ মূল্যে ছাড়া সরকারি এলপিজি কালোবাজারি হচ্ছে বলে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে অভিযোগ করে চিঠি দিয়েছে এলপি গ্যাস লিমিটেড নিজেই। এই সমস্যার সমাধানে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে বেসরকারি এলপিজির কাছাকাছি নেওয়ার প্রস্তাব করেছে তারা। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন মূল্য হিসাব না করে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে প্রকৃত নিম্ন আয়ের মানুষের সুলভে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ সামান্য যা আছে, তা-ও শূন্যের কোঠায় নেমে যেতে পারে।

বিইআরসির কাছে করা আবেদনে এলপি গ্যাস কোম্পানি বলেছে, বেসরকারি সিলিন্ডারের তুলনায় বিপিসির সিলিন্ডারের দাম অনেক কম হওয়ায় সরকারি গ্যাস বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরে—যে প্রক্রিয়াটি ‘ক্রস ফিলিং’ নামে পরিচিত—নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকেরা কম দামে সরকারি এলপি গ্যাস পাচ্ছেন না। কোম্পানিটির প্রস্তাব, যেহেতু একমাত্র সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) প্রোপেন ও বিউটেন ৩৫:৬৫ অনুপাতে মিশিয়ে এলপি গ্যাস তৈরি করা হয়, তাই বেসরকারি খাতের মতো সরকারি এলপিজির ক্ষেত্রেও দুটি উপাদানের সৌদি সিপি মূল্যের ভিত্তিতেই দাম নির্ধারণ করা উচিত। সৌদি সিপি (কন্ট্র্যাক্ট প্রাইস) হলো প্রতি মাসে সৌদি আরামকোর ঘোষণা করা এলপিজি ক্রয়-বিক্রয়ের আনুষ্ঠানিক বৈশ্বিক মূল্যসূচক।

এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ বলেন, তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কম হওয়ায় গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, ইআরএল থেকে ১৬ হাজার টন ও কৈলাশটিলার জালালাবাদ গ্যাসফিল্ড থেকে প্রায় ৫ হাজার টন গ্যাস পাওয়া যায়। সংস্কারের পর ইআরএলের সক্ষমতা দ্বিগুণ হলে এলপিজির সরবরাহ সক্ষমতাও আরেকটু বাড়বে। তার মতে, এলপিজির বাজারে বিপিসি বা কোনো সরকারি জ্বালানি কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়াতে নেওয়া পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

সরকারি বিতরণ কোম্পানি যমুনার তালিকাভুক্ত ডিলার হিসেবে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ব্যবসা করেন নাজির আহমেদ মোল্লা। তিনি বলেন, প্রতি মাসে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৭০টি সরকারি এলপিজি সিলিন্ডার তার ভাগে আসে। তবে অনেক পুরোনো বলে সিলিন্ডারের মান বেশ খারাপ থাকে। কিছু সিলিন্ডারে লিকেজ থাকায় গ্যাস বের হয়ে যায়। তাই বাসাবাড়ির গ্রাহকেরা নেন না; এগুলো মূলত হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাছেই বিক্রি করতে হয়। বরাদ্দের কমবেশি প্রসঙ্গে নাজির মোল্লা বলেন, ২০০৯ সালের দিকে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার বরাদ্দ পাওয়া যেত। কিন্তু একপর্যায়ে বরাদ্দ কমতে থাকে। মাঝখানে টানা দুই বছর সরকারি এলপি গ্যাস পাওয়া যায়নি। এখন আবার কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি এলপি গ্যাস বেসরকারি কোম্পানির বোতলে ভরে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা কেবল সরকারি এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে নয়, অন্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও এ রকম কথা শোনা যায়।’

আরেক ডিলার, নারায়ণগঞ্জের সোনালী এন্টারপ্রাইজের পরিচালক জানান, তার কাছে মাসে দু-একবার করে সরকারি এলপিজি সিলিন্ডার আসে। এগুলো দিনে দিনেই ভোক্তাদের কাছে চলে যায়।

সিলিন্ডারের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা, সীমিত আয়ের চাকরিজীবী শাহে আলম বলেন, ‘সরকারি এলপিজির নামই কেবল শুনেছি। কিন্তু বাজারে কখনো এই সিলিন্ডার দেখি নাই। এগুলো কারা কোথায় বিক্রি করে, আর কারাই-বা কেনার সুযোগ পায়, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সরকারি সুলভ মূল্যের এলপি গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। সে কারণে দেশীয় এই পণ্যের সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। দাম বাড়ানো অনিয়ম ঠেকানোর কোনো সমাধান নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাজারের সামান্য অংশীদারত্ব নিয়ে বসে থাকলে নানা অনিয়ম হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার আন্তরিক হলে বহু দরিদ্র মানুষের চাহিদা পূরণে এই পণ্য কাজে লাগানো যেত।’

অর্থনীতি ও ব্যবসা বিভাগের আরও খবর

লোকসানে ডুবে লভ্যাংশ দিতে পারল না তালিকাভুক্ত নয়টি কোম্পানি, এজিএমের তারিখ ঘোষণা
অর্থনীতি ও ব্যবসা

লোকসানে ডুবে লভ্যাংশ দিতে পারল না তালিকাভুক্ত নয়টি কোম্পানি, এজিএমের তারিখ ঘোষণা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়টি কোম্পানি ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্…

ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি সিস্টেম প্যাকেজে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাজ পেল ভারতের এলঅ্যান্ডটি
অর্থনীতি ও ব্যবসা

ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি সিস্টেম প্যাকেজে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাজ পেল ভারতের এলঅ্যান্ডটি

ভারতের অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুবরো (এলঅ্যান্ডটি) ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি সিস্টেম প্যাকেজের নকশা ও নির্মাণকাজের জন্য প্রায় একশ কোটি…

সরকারের ঋণচাহিদায় বাড়ছে ট্রেজারি বিলের সুদ: তিন সপ্তাহে ৯১ দিনের ইল্ড ৮.১৩ থেকে ৮.৫৫ শতাংশ, অক্টোবরে ঋণ ৬০ হাজার ৩০০ কোটির পথে
অর্থনীতি ও ব্যবসা

সরকারের ঋণচাহিদায় বাড়ছে ট্রেজারি বিলের সুদ: তিন সপ্তাহে ৯১ দিনের ইল্ড ৮.১৩ থেকে ৮.৫৫ শতাংশ, অক্টোবরে ঋণ ৬০ হাজার ৩০০ কোটির পথে

ঢাকায় সরকারের ঋণচাহিদা বাড়ায় ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যব…

ঢাকায় শুরু বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা, ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তির লক্ষ্য
অর্থনীতি ও ব্যবসা

ঢাকায় শুরু বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা, ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তির লক্ষ্য

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে ঢাকায়। ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার লক…