পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে নতুন বাজারে নজর: অগ্রাধিকার খাত আট থেকে বেড়ে ১২
তৈরি পোশাকের (আরএমজি) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ জোরদার করছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মান ও বিধিবিধান পরিপালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল সোর্সিং ডায়ালগে’ এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চেম্বার, ক্রেতা ফোরাম এবং বিদেশি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের উন্নয়নবিষয়ক কাউন্সেলর ও উপ-উন্নয়ন পরিচালক মার্টিন ডসন যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ (ডিসিটিএস)-এর আওতায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুযোগগুলো তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলো এ স্কিমের আওতায় বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার এখনো করতে পারেনি।
বাংলাদেশি উৎপাদকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও সোর্সিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন রপ্তানি আদেশ অর্জনের সুযোগ বাড়তে পারে।
ডিসিটিএস সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের সচেতনতা বাড়াতে ইপিবি ও ব্রিটিশ হাইকমিশন যৌথভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে স্কিমটির আওতায় সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং তা পরিপালনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শুল্কবহির্ভূত বাধা মোকাবিলা ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামে এবং তৈরি পোশাক খাতের জন্য আরও কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদারের অংশ হিসেবে এ বছর ইপিবি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রপ্তানি খাতের সংখ্যা আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করেছে। পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাময় শিল্প ও সেবাখাতকে রপ্তানি কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, শিল্প খাতের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের কাঠামোয় স্বাস্থ্যসেবার মতো সেবাখাত অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগকে কার্যকর রপ্তানি আদেশে রূপ দিতে ব্র্যান্ডিং, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়িক সংযোগ কার্যক্রম এবং প্রচারমূলক উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি অপ্রচলিত ও উদীয়মান পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে। পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল প্যাকেজিং সামগ্রীর আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইন্দোনেশিয়ার বাজারে পাটের সুতা, পাটের বস্তা, তামাক, তৈরি পোশাক ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তার মতো উচ্চমূল্যের খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রতিনিধি এসব খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, বিমান পরিবহন ও আতিথেয়তা শিল্পের প্রতিও অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ ২০১৫ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত একটি বাণিজ্য মেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি সোর্সিং প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের কাছে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরতে স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রচারচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এবং বাণিজ্য মেলার সরাসরি ভিডিও ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।



